• মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪১ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
ইউএনও নাঈমা খানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি শিক্ষার নামে আমরা আসলে কী তৈরি করছি? মুখস্থনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা ও বৈষম্যের ফাঁদে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ফকিরহাটে এসএসসি-দাখিলে ভালো ফল, ভোকেশনালে হতাশা; জিপিএ-৫ পেল ১১৫ জন দক্ষিণ সুরমায় মাদকবিরোধী অভিযানের সমর্থনে এলাকাবাসীর বিশাল মানববন্ধন নাগেশ্বরীতে ইউএনওর সঙ্গে অনলাইন প্রেস ক্লাব নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিতভাবে কাজের নির্দেশ ডিআইজি আশিক সাঈদের অপপ্রচার মোকাবিলায় দৌলতখানে জমজমাট বিতর্ক ও সচেতনতামূলক আলোচনা আশুগঞ্জে ১ লাখ ৪৪ হাজার বিদেশি সিগারেট উদ্ধার, সিএনজিসহ গ্রেপ্তার ৩ ‎ফকিরহাটে মৎস্য ঘের থেকে কর্মচারীর ম/রা/দে/হ উদ্ধার সালমান শাহ হ/ত্যা মামলায় অভিনেতা ডন গ্রে/প্তা/র

শিক্ষার নামে আমরা আসলে কী তৈরি করছি? মুখস্থনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা ও বৈষম্যের ফাঁদে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ কোথায় হওয়া উচিত—অবকাঠামোয়, প্রযুক্তিতে, নাকি মানুষের ওপর?

উন্নত বিশ্ব অনেক আগেই বুঝেছে, সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ হলো মানুষের মেধা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ। কারণ একটি সেতু, একটি মহাসড়ক কিংবা একটি ভবন একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে; কিন্তু দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিক নাগরিক তৈরি করতে না পারলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

বাংলাদেশও শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে। পরীক্ষায় পাস করছে, সার্টিফিকেট অর্জন করছে। কিন্তু এর পরেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে—

আমরা কি শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু সার্টিফিকেটধারী মানুষ তৈরি করছি?এই প্রশ্নটি এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে বাস্তব জীবনের একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়।

কারণ আমাদের শিক্ষার বড় একটি অংশ এখনো ‘কী লিখলে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যাবে’—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।কেন?’কীভাবে?,এর বিকল্প কী?’ ,বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ কোথায়?’

এসব প্রশ্নের চেয়ে পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন ও উত্তর অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।ফলে শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেশি মনোযোগী হয় ।এখানেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট।শিক্ষা যদি বিদ্যালয়েই পর্যাপ্তভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে একটি শিশুর শিক্ষার জন্য পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কেন তৈরি হবে?

অনেক পরিবার সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করতে গিয়ে পারিবারিক বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করে। শহর থেকে গ্রাম—বিভিন্ন পর্যায়ে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, গাইড বই ও অতিরিক্ত শিক্ষা উপকরণের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—বিদ্যালয় যদি শিক্ষার মূল প্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষা পাওয়ার জন্য এত বড় নির্ভরতা কেন তৈরি হলো?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু শিক্ষার্থীকে নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকেই পর্যালোচনা করতে হবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের একটি ক্ষেত্র হলো সুযোগের বৈষম্য।একজন শহরে শিক্ষার্থী হয়তো আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, দক্ষ শিক্ষক, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও নানা ধরনের সহায়ক সুবিধা পাচ্ছে।

অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী হয়তো পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, প্রযুক্তি বা মানসম্মত শিক্ষা উপকরণের অভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

দুই শিক্ষার্থী একই পরীক্ষায় বসছে। কিন্তু তাদের প্রস্তুতির পরিবেশ কি একই?যদি না হয়, তাহলে শুধু ফলাফল দিয়ে মেধার বিচার কতটা ন্যায়সংগত?শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা হলে সাধারণত নতুন কারিকুলাম, নতুন বই, পরীক্ষা পদ্ধতি ও প্রযুক্তির কথা বলা হয়।কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়?

তিনি হলেন—শিক্ষক।একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় শেষ করেন না। তিনি একজন শিশুর চিন্তার জগত তৈরি করেন। একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক একটি জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেন।

তাই শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, যথাযথ প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, জবাবদিহি এবং মর্যাদা নিশ্চিত না করে কোনো শিক্ষা সংস্কারই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না।শিক্ষার আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—আমাদের উচ্চশিক্ষা কি শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে?বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের চেহারা বদলে দিচ্ছে।

আগামী দিনের চাকরির বাজারে শুধু একটি ডিগ্রি যথেষ্ট নাও হতে পারে।

প্রয়োজন হবে—সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নতুন কিছু শেখার সক্ষমতা।

অথচ আমরা যদি শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করি, তাহলে তারা পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে কীভাবে?কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়। এটি বর্তমানের বাস্তবতা।

একজন শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডে কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। একটি সফটওয়্যার লেখা, অনুবাদ, বিশ্লেষণ কিংবা উপস্থাপনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

তাহলে শিক্ষকের কাজ কী হবে?শিক্ষার্থীর কাজই বা কী হবে?এখানেই শিক্ষার মৌলিক দর্শন নতুন করে ভাবতে হবে।তথ্য মুখস্থ করার ক্ষমতার চেয়ে তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নৈতিকভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা ভবিষ্যতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

অর্থাৎ প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার প্রয়োজন কমছে না—বরং সঠিক শিক্ষার প্রয়োজন আরও বাড়ছে।একটি শিশুর মেধা কি একটি পরীক্ষার কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশ করা সম্ভব?কেউ গণিতে ভালো, কেউ ভাষায়, কেউ বিজ্ঞানে, কেউ শিল্পে, কেউ নেতৃত্বে, কেউ প্রযুক্তিতে। অথচ প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি অনেক সময় শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বিচার করে।

ফলে যে শিক্ষার্থী প্রচলিত পরীক্ষায় অসাধারণ নয়, সে হয়তো জীবনের অন্য ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভা দেখাতে পারে।

শিক্ষার দায়িত্ব হওয়া উচিত সেই প্রতিভা খুঁজে বের করা।শিক্ষার্থীকে নম্বরের পেছনে দৌড় করানো নয়; শিক্ষার্থীকে নিজের সম্ভাবনার পেছনে দৌড়াতে শেখানোই হওয়া উচিত শিক্ষার লক্ষ্য।আমরা দক্ষ প্রকৌশলী চাই, দক্ষ চিকিৎসক চাই, দক্ষ প্রশাসক চাই, দক্ষ সাংবাদিক চাই, দক্ষ ব্যবসায়ী চাই।

কিন্তু তাদের সঙ্গে আমরা কি সৎ মানুষও চাই?একজন মানুষ উচ্চশিক্ষিত হলেই নৈতিক হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।তাই শিক্ষার সঙ্গে সততা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে।কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত একজন শিক্ষিত মানুষ কখনো কখনো অশিক্ষিত অপরাধীর চেয়েও সমাজের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারেন।

শিক্ষা সংস্কার শুধু নতুন বই ছাপিয়ে বা নতুন পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করে সম্ভব নয়।প্রথমে প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা—যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বারবার বদলে যাবে না।

প্রয়োজন— শিক্ষকতার মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি; শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ; শহর ও গ্রামের শিক্ষা বৈষম্য কমানো;মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে সৃজনশীল ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা;কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ;প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথাযথ ব্যবহার;পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়ন; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি;গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি;এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখা।

আমরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাই। বই কিনি। পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করি। ভালো ফল করলে আনন্দিত হই, খারাপ হলে হতাশ হই।কিন্তু আমরা কি কখনো সন্তানকে জিজ্ঞেস করি—তুমি কী শিখলে?” নাকি শুধু জিজ্ঞেস করি—কত নম্বর পেয়েছ?” এই দুটি প্রশ্নের পার্থক্যের মধ্যেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সংকট লুকিয়ে আছে।

কারণ নম্বর একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল বলতে পারে; কিন্তু তার চিন্তা, বিবেক, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পুরোপুরি বলতে পারে না।একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু বড় বড় ভবনে নয়, শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে বসে তৈরি হয়।

তাই আজ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—আমরা কি এমন প্রজন্ম তৈরি করব, যারা শুধু পরীক্ষায় পাস করবে?
নাকি এমন প্রজন্ম তৈরি করব, যারা জীবন, সমাজ ও বিশ্বকে বদলে দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে?

শিক্ষার প্রশ্নটি তাই কোনো মন্ত্রণালয়ের একক প্রশ্ন নয়।এটি রাষ্ট্রের প্রশ্ন।,এটি সমাজের প্রশ্ন।,এটি অভিভাবকের প্রশ্ন।এবং সর্বোপরি—এটি আমাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd