মোঃ শাহজাহান বাশার,
বিনিয়োগে খরা—বন্ধ হচ্ছে কারখানা, চাকরি হারিয়েছেন ১৪ লাখ মানুষ।
মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
দেশে কর্মসংস্থান সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। শিল্পায়নের গতি থেমে গেছে, বিনিয়োগে নেমেছে খরা। নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না, পুরোনো শিল্পের বেশিরভাগই টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে একদিকে কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন—এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দেশের বেকারত্ব বাড়ার মূল কারণ হলো বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা ও অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিলে দ্রুত শিল্পায়ন সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন—দুর্নীতিবাজ মালিকের বিচার হতে পারে, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলে শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অযথা বেকার করে দেওয়া হয়, যা পুরো অর্থনীতিকে চাপে ফেলে।
গত এক বছরে বিগত সরকারের সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন অন্তত শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এক লাখের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা কাজ হারিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার এসব মালিকদের আইনের আওতায় আনলেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর বেশিরভাগ এখনো চালু হয়নি। কয়েকটিতে প্রশাসক বসানো হলেও কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে পারেনি। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এখনও কর্মহীনতার অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “গত তিন বছরে ৩২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তিন লাখের বেশি শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। ব্যবসার খরচ লাগামহীনভাবে বাড়ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা কমছে না—এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ আসে না।”
শিল্পায়ন থমকে—চাকরি হারিয়েছেন ১৪ লাখ মানুষ
হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ বলেন, “দেশে শিল্পায়নের গতি থেমে যাওয়ায় কমপক্ষে ১৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। প্রতিবছর ৩০ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে আসে, কিন্তু সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার, বিদেশে ৮ লাখ এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ১০ লাখ। বাকিরা বেকার থেকে যান।”
অর্থনীতিবিদদের মতে—বেকারত্বের এই চাপ দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিনিয়োগ ফাঁদে বাংলাদেশ—বিআইডিএস প্রতিবেদন
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেক কম। জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হারও তেমন সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ এক ধরনের বিনিয়োগ ফাঁদের মধ্যে পড়ে আছে, যা থেকে বের না হলে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
বিআইডিএস বলছে—বিনিয়োগ পরিবেশ, অবকাঠামো
অর্থায়ন সুবিধার ঘাটতি, এসব দ্রুত সমাধান করতে না পারলে বেকারত্ব বাড়তেই থাকবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ না পেলে তাকে বেকার ধরা হয়। এ হিসেবে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের বেশি।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, “বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে কেউ বেকার নয়—এটি জীবিকা নিশ্চিত করে না। তাই প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখের থেকেও অনেক বেশি।”
বিবিএসের তথ্য বলছে—গত ১০ বছর ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫–২৭ লাখ,বিভাগভেদে বেকার
ঢাকা—সর্বোচ্চ, চট্টগ্রাম—৫.৮৪ লাখ,রাজশাহী—৩.৫৭ লাখ
খুলনা—৩.৩১ লাখ,সিলেট—২.১৬ লাখ, রংপুর—২.০৬ লাখ,বরিশাল—১.৩৯ লাখ,ময়মনসিংহ—১.০৪ লাখ,ছদ্ম বেকার—প্রায় ১ কোটি, মোট বেকারের ৭৬% এর বয়স ১৫–২৯ বছর
উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ, স্নাতক ডিগ্রিধারী—১৩.৫%,উচ্চমাধ্যমিক পাস—৭.১৩%, কর্মসংস্থানের শূন্যতা—সমাজে নেমে আসছে হতাশা
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন,
“বেকারত্ব বাড়া দেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। কাজ না থাকলে আশা বদলে যায় ক্ষোভে। বেকার মানুষ সমাজ, পরিবার ও দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।”
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন—দেশকে এখনই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিতে হবে। তাদের মতে
১) রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
২) বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি
৩) কম সুদে ঋণসহায়তা
৪) প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন
৫) এসএমই খাতে ব্যাপক প্রণোদনা
৬) বন্ধ কারখানা দ্রুত পুনরুজ্জীবন
এই পদক্ষেপ এখন জরুরি। নইলে বেকারত্বের ঘূর্ণাবর্ত থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।