হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোরে বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকাল ১১টার সময় উপজেলার বিল কুমারী বিলের বুকজুড়ে চোখে পড়ে সবুজ আর সোনালী ধানের অপরূপ সমারোহ। দিগন্তজোড়া পাকা ধানের শীষ বাতাসে দুলছে, আর সেই দৃশ্য যেন কৃষকের মনে এনে দিয়েছে একরাশ প্রশান্তি ও আশার আলো।
বিলপাড়ের হাজারো কৃষক এখন নতুন স্বপ্নে বিভোর। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হবে বোরো ধান কাটার উৎসব। তবে আনন্দের মাঝেও কৃষকের চোখেমুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ—ধানের দরপতন এবং মৎস্যজীবীদের দুরবস্থা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস ও স্থানীয় কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বিলে ধানের রোগবালাই ছিল খুবই সীমিত এবং পোকা-মাকড়ের উপদ্রবও ছিল কম। সেচ ও বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি না থাকায় এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ধানের ফলন হয়েছে চমৎকার।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী—
নিজস্ব জমিতে বিঘাপ্রতি চাষ খরচ হয়েছে প্রায় ১৪–১৫ হাজার টাকা
লিজ নেওয়া জমিতে খরচ পড়েছে ১৮–২২ হাজার টাকা
প্রত্যাশিত ফলন প্রতি বিঘায় ৩০–৩৫ মণ
এই হিসাব অনুযায়ী এবারের ফলনকে বাম্পার বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাম্পার ফলনের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে ধানের বাজার দর পতন। কৃষকদের অভিযোগ, গত কয়েক দিনের ব্যবধানে ধানের দাম মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে।
তারা জানান,পরিবহন ব্যবস্থার ব্যাঘাত বাজারে চাহিদা কমে যাওয়াএসব কারণে ধানের বাজারে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়া ও সম্ভাব্য ঝড়ের আশঙ্কাও কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।
বিলের একদিকে যখন কৃষকের সোনালী স্বপ্ন দুলছে, অন্যদিকে একই বিলে পানির অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন হাজারো মৎস্যজীবী পরিবার।
জানা গেছে,বিলের মূল অভয়াশ্রম অংশেও পানি নেই গত দেড় মাস ধরে বিলে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না মৎস্যজীবী আসরাফুল ও আলম বলেন,আমরা পুরোপুরি বিলের মাছের ওপর নির্ভরশীল। এখন মাছ না থাকায় এনজিওর কিস্তি দেওয়া ও পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তানোর পৌরসভার বিএস আকবর আলী জানান, ধানে ইতোমধ্যে পাক ধরেছে এবং কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন,
“চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাবেন বলে আশা করছি। তানোরের বিল কুমারী বিল এখন সম্ভাবনার প্রতীক। একদিকে বাম্পার ফলনের আশায় উচ্ছ্বসিত কৃষক, অন্যদিকে বাজারদর পতন ও মৎস্য সংকটে দিশেহারা সাধারণ মানুষ। সবকিছু ঠিক থাকলে সামনে ধান কাটার উৎসব গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে। তবে বাজার স্থিতিশীলতা ও মৎস্যজীবীদের সহায়তা নিশ্চিত না হলে এই সোনালী স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে।