হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীর তানোর উপজেলায় আলুর সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে ওঠা সরিষা ফুলের হলুদ সমারোহে যেন রঙিন হয়ে উঠেছে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। সবুজের মাঝে হলুদের এই অপরূপ দৃশ্য আর সরিষা ফুলের মৌ মৌ গন্ধে প্রকৃতি যেমন মনোমুগ্ধকর রূপ ধারণ করেছে, তেমনি এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই মাঠে ছুটে যাচ্ছেন নানা বয়সী মানুষ।
হালকা বাতাসে দোল খাওয়া সরিষা ফুলে ভরে উঠেছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠঘাট। আলুর সবুজ পাতার মাঝে ছড়িয়ে থাকা হলুদ ফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে। মহান সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য নিদর্শন যেন চোখের সামনে মেলে ধরেছে তানোরের গ্রামীণ জনপদ।
অল্প খরচে লাভ বেশি, ঝুঁকি কম
অল্প খরচে তুলনামূলক বেশি লাভ হওয়ায় এ বছর সরিষা চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের মধ্যে। উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষক সামিউল ইসলাম জানান,
“এবার আমাদের এলাকায় অনেকেই সরিষা চাষ করেছেন। সরিষা চাষে খরচ খুব কম, ফলন ভালো হলে লাভও বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া তেমন কোনো ঝুঁকিও নেই। একই এলাকার কৃষক মুন্টু জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে সরিষা বপন করেছেন। গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং প্রতিটি গাছেই এখন হলুদ ফুল ফুটে আছে।
কৃষক আলম দেড় বিঘা এবং লুৎফর এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। তাঁদের জমিতে সরিষার বয়স বর্তমানে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ দিন।
তানোর পৌর এলাকার কৃষক মামুন প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে সরিষা বপন করেছেন। তিনি বলেন,
“প্রথমবার চাষ করেও ভালো ফল পাচ্ছি। প্রতিটি গাছেই সুন্দর হলুদ ফুল এসেছে। আশা করছি ফলন ভালো হবে।”
এছাড়া কালাম তিন বিঘা, আলতাব দুই বিঘা, রুহুল এক বিঘা এবং জাকারিয়া প্রায় ১৫ কাঠা জমিতে সরিষা চাষ করেছেন। তারা জানান, প্রায় একই সময়ে বপন করায় সবার জমিতে গাছের বৃদ্ধি সমানভাবে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, এসব মাঠে অতীতে তেমন সরিষা চাষ হতো না। কিন্তু এবছর খরচ কম ও লাভজনক হওয়ায় অনেকেই সরিষা চাষে ঝুঁকেছেন।
কৃষক শাকিল আরও জানান,
এক বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করতে আনুমানিক—
৩০ কেজি ডিএপি
১৫ কেজি ইউরিয়া
১৫ কেজি পটাশ
১৫ কেজি জিপসাম
২–১ বার কীটনাশক ও সেচসহ
মোট খরচ হয় প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা।
এক বিঘা জমিতে গড়ে ৫ থেকে ৬ মন সরিষা উৎপাদন হয়। বর্তমানে বাজারে প্রতি মন সরিষার দাম প্রায় ৩ হাজার টাকা। সে হিসাবে—
৫ মন ফলনে আয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা ৬ মন ফলনে আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা এছাড়া বাড়ির তেলের চাহিদা পূরণ, গরুর খৈল এবং সরিষা গাছের ডাল রান্নার কাজে ব্যবহার করায় কৃষকরা বাড়তি সুবিধাও পাচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান,যেসব ফসল চাষে কম পানি লাগে, সেগুলো চাষ করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কারণ তানোর উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হুমকির মুখে। যত কম পানি ব্যবহার হবে, আগামীর প্রজন্মের জন্য ততই ভালো। তিনি আরও জানান, এ বছর উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। সরিষা চাষে রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং কীটনাশকেরও তেমন প্রয়োজন হয় না। তিন মাসের মধ্যেই ফসল উত্তোলন করা যায়। এক বিঘায় যে পরিমাণ খরচ হয়, তার দ্বিগুণ লাভ পান কৃষকরা। বিশেষ করে বাঁধাইড় ইউনিয়নে অনেক কৃষক আম বাগানের ফাঁকেও সরিষা চাষ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সরিষা গাছে গাছে ফুল ফুটেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে কৃষকরা এবার কাঙ্ক্ষিত ফলন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কোনো ধরনের রোগবালাই দেখা দিলে কৃষি অফিসের মাঠকর্মী অথবা অফিসে এসে পরামর্শ নেওয়ার জন্য কৃষকদের আহ্বান জানান এই কর্মকর্তা।