হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিল কুমারী এখন প্রায় মাছশূন্য। বছরের এই সময়ে যেখানে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ওঠার কথা, সেখানে দিনের পর দিন জাল ফেলে এক কেজি মাছও পাচ্ছেন না বিলপাড়ের মৎস্যজীবীরা। ফলে কনকনে শীত উপেক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের শেষ অবলম্বন হিসেবে শামুক মারার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছেন শত শত জেলে।
তানোরজুড়ে প্রচণ্ড শীত জেঁকে বসেছে। শীতলীপাড়া, কুঠিপাড়া ও গোল্লাপাড়া হলদারপাড়াসহ তানোর পৌর সদরের বিলপাড়ের জেলেরা বছরের পর বছর বিলের মাছ ধরেই সংসার পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু দিনের পর দিন বিলের পানি কমে যাওয়ায় মাছের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে জেলেদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
মাছ নেই, তাই শামুকই ভরসা
শীতলীপাড়া গ্রামের জেলে সাদ্দাম হোসেন জানান,
“দিন-রাত বিলে জাল ফেলেও এক কেজি মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। কনকনে শীতের মধ্যেও নৌকা নিয়ে বিল চষে বেড়াচ্ছি, কিন্তু মাছ নেই। আমাদের জীবন-জীবিকা বিলের মাছের ওপর নির্ভরশীল। মাছ না পেয়ে বাধ্য হয়ে শামুক মারছি।”
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিল কুমারী বা শীব নদীর ব্রিজ থেকে ধানতৈড় ও গুবিরপাড়া গ্রামের সামনের অংশেই বর্তমানে সামান্য পানি রয়েছে। ওই অংশেই রয়েছে সরকারি অভয়াশ্রম, যেখানে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় জাল ফেলতে পারেন না জেলেরা। অল্প যে পানি রয়েছে, সেখানে শত শত নৌকা নামলেও মাছ মিলছে না। কিস্তির চাপ, অনাহারের শঙ্কা
শীতলীপাড়া গ্রামের মুন্তাজ, সাগরসহ একাধিক জেলে বলেন,
“দিনে-রাতে জাল ফেলে এক থেকে দুই কেজি মাছ পাওয়া যায়, যা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। আমরা দরিদ্র জনগোষ্ঠী। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে জাল, নৌকা কিনেছি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। মাছ না পাওয়ায় তিন বেলা খাওয়ার জোগান নেই, তবুও কিস্তি বন্ধ নেই।এই পরিস্থিতিতে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে শামুক মারাকে বিকল্প পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
শামুক মারার হিসাব-নিকাশ
শীতলীপাড়া গ্রামের জেলে নুরুল ইসলাম জানান,
“আমরা ১২ জন মিলে ছয়টি নৌকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শামুক মারি। দিনে ৭০ থেকে ৮০ বস্তা শামুক পাওয়া যায়। প্রতিটি বস্তায় ৪২ কেজি শামুক থাকে। এক বস্তা ১৯০ টাকায় বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে দিনে প্রায় ১৫ হাজার টাকার শামুক বিক্রি হয়। ভাগ করে জনপ্রতি এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার তিনশ টাকা পাই। আবার অনেক দিন ৫০০ টাকাও জোটে না। তার দলের সদস্য তোতা, সজিব, বাবু ও সোনা জানান, প্রায় এক মাস ধরে তারা শামুক মেরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের দেখাদেখি এখন ৪০-৫০টি নৌকা নিয়ে ৪-৫টি দলে বিভক্ত হয়ে জেলেরা শামুক মারছেন। তবে প্রথম দিকে যে পরিমাণ শামুক পাওয়া যেত, এখন তা কমে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আর ১৫-২০ দিন শামুক পাওয়া যাবে। এরপর আবার বেকার হয়ে পড়বেন তারা।
বাইরের জেলায় যাচ্ছে শামুক
জেলেরা সন্ধ্যার দিকে শীব নদীর ব্রিজে শামুক বিক্রি করেন। সেখানে নাটোর, ঈশ্বরদী, সিরাজগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ট্রাক ও পিকআপ এসে শামুক কিনে নেয়। এসব শামুক মূলত মাছ ও হাঁসের খামারে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে জেলেদের অভিযোগ, প্রচণ্ড কষ্টের তুলনায় শামুকের দাম খুবই কম। দাম একটু বেশি হলে তাদের আয় আরও বাড়ত।
কুঠিপাড়া গ্রামের মিলন ও আজাদ জানান,চাঁন্দুড়িয়া ব্রিজ থেকে চৌবাড়িয়া ব্রিজ পর্যন্ত বিলের বড় অংশ এখন শুকিয়ে খালের মতো হয়ে গেছে। কেউ কেউ সীমানা নির্ধারণ করে সেচ বা সামান্য মাছ ধরে। বিলের মূল অংশ গোল্লাপাড়া খাদ্য গুদামের পূর্বদিকে শীব নদীর সেতু থেকে গুবিরপাড়া পর্যন্ত, যেখানে সরকারি অভয়াশ্রম রয়েছে। সেখানে জাল ফেলা নিষেধ।”
জেলেদের অভিযোগ, গত বছরগুলোর তুলনায় এবার মাছের সংকট বেশি। যদিও গত নভেম্বরের শুরুতে এক রাতের ভারী বর্ষণে বিলের পানি বেড়ে পুকুরের মাছ বিলে চলে এসেছিল। সে সময় নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ছোট-বড় মাছ ধরায় জেলে পল্লীতে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু নির্বিচারে ছোট মাছ নিধনের কারণে এখন বিলে মাছের বংশ বৃদ্ধি হয়নি।
মৎস্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মৎস্যজীবী কলিমসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন,
“উপজেলা মৎস্য দপ্তর বিলে মাছ আছে কি না, সে বিষয়ে কোনো খোঁজখবর নেয় না। বিলে মাছ ছাড়লেও আমরা জানি না। সরকারি বরাদ্দ এলেও প্রকৃত জেলেরা তা পায় না। একসময় বিলের মাছ দিয়ে মাছের মেলা বসত, এখন সেটাও নেই। এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাজু চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জেলেদের দাবি, শামুক মারাও সাময়িক। এরপর তাদের সামনে কোনো বিকল্প পেশা নেই। কৃষি কাজ করতে না পারায় বছরের এই সময়টায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা চরম সংকটে পড়েন। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও বিল ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে জেলেদের দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হতো বলে মনে করছেন তারা।