মোঃ শাহজাহান বাশার
নওগাঁর সাপাহারে ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশের এক নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একজন বাসচালককে অফিসে ডেকে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত হলেন সাপাহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শ্যামলী রানী বর্মণ এবং তাঁর স্বামী কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ।
ভুক্তভোগী বাদল রাজশাহীগামী ‘হিমাচল’ পরিবহনের একজন চালক।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কলেজ শিক্ষক জয়ন্ত বর্মণ ‘হিমাচল’ পরিবহনের একটি বাসে স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটে যাত্রা শুরু করেন। বাসে একটি আসন ফাঁকা থাকায় তিনি সেখানে বসেন। কিন্তু দিঘার মোড় স্টপেজে ওই আসনের নির্ধারিত যাত্রী উঠলে বাসের সুপারভাইজার নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে সিট ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জয়ন্ত বর্মণ। তিনি নিজেকে সাপাহার সার্কেলের এএসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে সুপারভাইজারকে হুমকি ও ধমক দিতে থাকেন। একপর্যায়ে চালক বাদলের সঙ্গেও বাকবিতণ্ডায় জড়ান। পরে ধানসুরা এলাকায় নামার সময় চালক ও সুপারভাইজারকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দিয়ে চলে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
অভিযোগ রয়েছে, বাস থেকে নামার পরপরই জয়ন্ত বর্মণ বিষয়টি তাঁর স্ত্রী এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণকে অবহিত করেন। এরপর এএসপি সাপাহার বাসস্ট্যান্ডের টিকিট মাস্টারকে অফিসে ডেকে নেন এবং তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে চালক বাদল ও সুপারভাইজারকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকেন।
রাত আনুমানিক ১০টার দিকে হিমাচল পরিবহনের বাসটি পুনরায় সাপাহারে ফিরলে বাসচালক বাদলকে বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি এএসপির অফিসে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর অভিযোগ অনুযায়ী এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ বাদলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং কোনো কথা না বলেই তাকে লাথি মারেন। এরপর তাঁর স্বামী জয়ন্ত বর্মণও মারধরে অংশ নেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এ সময় এএসপির নির্দেশে কনস্টেবল আনন্দ বর্মণ একটি লোহার পাইপ দিয়ে তাকে নির্মমভাবে পেটান। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
বাদলের ভাষ্যমতে, মারধরের একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। পরে তাকে শর্ত দেওয়া হয়—সাপাহারের কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া যাবে না। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন সোমবার তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
বাসচালক বাদল বলেন,
“আমি একজন শ্রমিক বলেই কি মানুষ না? এএসপি ম্যাডাম আর তাঁর স্বামী আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে মারধর করেছে। ম্যাডাম বডিগার্ডকে বলছিলেন—‘মাইরা হাত-পা ভেঙে দে’। এসএস পাইপ দিয়ে আমাকে পেটানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।”
চিকিৎসকদের দেওয়া প্রেসক্রিপশনে পুলিশি নির্যাতনের আলামত উল্লেখ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার ঘটনাটিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে মন্তব্য করলেও ভুক্তভোগীর বক্তব্য, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে ঘটনাটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অভিযোগ সত্য হলে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন চিত্র।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। নির্যাতিত মোটর শ্রমিক একতা ঐক্য সমগ্র বাংলাদেশ জলঢাকা উপজেলা শাখাও দ্রুত তদন্ত এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাপাহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মণের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে।