হামিদুর রহমান, তানোর (রাজশাহী)প্রতিনিধি:
তানোরে জ্বালানি সংকট ও ধানের দামের ধসে উপজেলায় বোরো ধান কাটা নিয়ে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বহিরাগত শ্রমিক না আসায় পাকা ধান মাঠেই পড়ে রয়েছে। শ্রমিক সংকট, তীব্র তাপপ্রবাহ ও সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টির কারণে কৃষকদের রক্ত-ঘামের সোনালি ফসল যেন এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন বিলাঞ্চল, বিশেষ করে বিলকুমারী বিল এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া মাঠ জুড়ে পাকা ধান। তবে নিচু জমির অধিকাংশ ধান ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাটিতে নুয়ে পড়েছে, আর উঁচু জমির ধান এখনো খাড়া অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। কৃষকরা জানান, প্রতিবছর ধান কাটার আগেই চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা এসে জমি দেখে যেত। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জ্বালানি সংকটের কারণে তারা নিজস্ব ট্রলি বা গাড়ি নিয়ে আসতে পারছেন না। কৃষক মানিক বলেন,“কয়েকদিন ধরে শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের দাম কম হওয়ায় শ্রমিকরা আসতে চাচ্ছে না। আবার তেল না থাকায় গাড়িও চলছে না। পাকা ধান নিয়ে আমরা মহা বিপদে পড়েছি।”
আরেক কৃষক সাহেব আলী জানান,“ধান কাটার উপযুক্ত সময় এখন। কিন্তু শ্রমিক নেই। উপরন্তু তীব্র গরমে কাজ করাও কঠিন। নিচু জমির ধান মাটিতে পড়ে গেছে—এগুলো কাটতে শ্রমিকরা রাজি না, আর কাটলেও খরচ দ্বিগুণ।”
দামে ধস, খরচে লাগাম নেই
বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে ধান বিক্রি করে শ্রমিকের খরচই ওঠে না।
বিঘা প্রতি চাষ থেকে কাটাই-মাড়াই পর্যন্ত খরচ প্রায় ২৩ হাজার টাকা
উৎপাদন ২৫–২৮ মণ ধান
বাজারদর অনুযায়ী আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা ফলে বিঘা প্রতি লোকসান হচ্ছে ৩–৪ হাজার টাকা।স্থানীয় কৃষকরা জানান,
চুক্তিভিত্তিক ধান কাটতে বিঘা প্রতি ৪–৫ মণ ধান দিতে হচ্ছে, তবুও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকটে পরিবহনও বন্ধ
ধান কাটার পর ট্রলিতে করে সড়কে আনার প্রচলন থাকলেও তেলের অভাবে অধিকাংশ ট্রলি বন্ধ রয়েছে। ফলে ধান মাঠ থেকে ঘরে তোলাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষক আলম ও রাহিমুল বলেন,
“বহিরাগত শ্রমিকরা ট্রলি নিয়ে আসত। কিন্তু তেল না থাকায় তারা আসতে পারছে না। স্থানীয় শ্রমিক খুবই কম—তাই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।”
ঝড়, তাপপ্রবাহ ও রোগের আক্রমণ চলমান বৈশাখ মাসে তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক জমির ধান মাটিতে পড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাতাপোড়া (বিএলবি) রোগের প্রাদুর্ভাব, যার কারণে অনেক ধান চিটা হয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা জানান, কীটনাশক ব্যবহার করেও এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিলাঞ্চলে ধানের চিত্র
উপজেলার চান্দুড়িয়া, কামারগাঁ, তালন্দসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রামের নিচে বিস্তৃত বিলাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। কালীগঞ্জ, মাসিন্দা, হাবিবনগর, বুরুজ, ভদ্রখণ্ড, কাশিমবাজার, চাঁদপুর, আমশো, মথুরাপুর, সরকারপাড়া, তাতিয়ালপাড়া, গোল্লাপাড়া, কুঠিপাড়া, হিন্দুপাড়া, গুবিরপাড়া, সিন্দুকাই, গোকুল, বেলপুকুরিয়া, বাহাড়িয়া, সুমাসপুরসহ বহু এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, উপজেলায় প্রায় ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর বিলাঞ্চল। অধিকাংশ ধান ইতোমধ্যে পেকে গেছে।
তিনি বলেন,যেভাবেই হোক দ্রুত ধান কাটতে হবে। বৈশাখ মাসে যেকোনো সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে, এতে কৃষকদের ক্ষতি আরও বাড়বে।”
কৃষকের আর্তনাদ—ধান চাষ কি অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, দামের পতন, শ্রমিক সংকট ও জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে ধান চাষ এখন অলাভজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন তারা। কৃষক পলাশের কথায়,
“মাটিতে পড়ে থাকা ধান কাটতে শ্রমিক বেশি লাগে, খরচও বেশি। আগের তুলনায় মাড়াই খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমরা দিশেহারা। তানোরের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে পাকা ধানের সমারোহ এখন আর আনন্দের নয়, বরং দুশ্চিন্তার কারণ। সময়মতো ধান কাটতে না পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের দাবি—জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং শ্রমিক সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।