হামিদুর রহমান,রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:
রাজশাহীর তানোরে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খানের বিরুদ্ধে পক্ষপাত ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত ইউএনওর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কিংবা দলীয় বিবেচনায় প্রার্থী বাছাইয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্য থেকে পরীক্ষার ফলাফল ও নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতেই ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো নির্বাচিত প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকলেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দলীয়করণ হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে।
পরীক্ষার ফলাফল ও যোগ্যতাই ছিল মূল বিবেচনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে আগ্রহী প্রার্থীদের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষার ফলাফল এবং নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের নির্বাচন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ কারণে কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এনে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দলীয়করণ হিসেবে আখ্যায়িত করার আগে পরীক্ষার ফলাফল, প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন, কোনো প্রার্থী যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অযোগ্য হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগই বা দেওয়া হলো কেন? আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পর নির্ধারিত মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়ে দায়িত্ব পেলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা কতটা যুক্তিসঙ্গত—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারি কোনো নিয়োগ বা জনবল বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। তবে তদন্তের আগে কোনো কর্মকর্তাকে পক্ষপাতদুষ্ট বা দলীয়করণের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হলে তা প্রশাসনিকভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।
একজন স্থানীয় নাগরিক বলেন, “কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই প্রমাণসহ তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে—এমন কারণে ইউএনওকে দলীয়করণের সঙ্গে জড়ানো ঠিক নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নথিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।”
একাধিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ইউএনও নাঈমা খান
তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাঈমা খানকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তানোর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বও তাঁর ওপর রয়েছে।
এর মধ্যেও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, গণশুনানি, ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
‘সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা’—স্থানীয়দের মূল্যায়ন
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তানোরে যোগদানের পর থেকে ইউএনও নাঈমা খান প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে সক্রিয় রয়েছেন। নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা শোনা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর পরিদর্শন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকিতে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “নাঈমা খান একজন সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর দায়িত্ব সরকারি বিধি-বিধান ও নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে সরকারি কর্মসূচির জন্য জনবল নিয়োগ দেওয়া তাঁর দায়িত্বের অংশ নয়। তাই নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেটি প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।”
নিয়োগসংক্রান্ত নথি যাচাইয়ের আহ্বান
সচেতন মহলের মতে, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের জনবল নিয়োগে কোনো অনিয়ম বা পক্ষপাতের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করা।
এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উপস্থিতির তালিকা, পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর, মূল্যায়ন পদ্ধতি, মেধাক্রম, নির্বাচিতদের তালিকা এবং নিয়োগসংক্রান্ত অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকলে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে অযথা বিতর্কে জড়ানোও অনুচিত বলে মনে করছেন তারা।
দলীয় পরিচয় বনাম প্রশাসনিক দায়িত্ব
স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান সময়ে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়টি সামনে এনে সরকারি কোনো কর্মসূচির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ হলেও, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি দলীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনতে হলে তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কোনো নির্বাচিত প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ করে না যে নিয়োগকারী কর্মকর্তা রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁকে নির্বাচিত করেছেন। বরং প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কে কত নম্বর পেয়েছেন, কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ই মূলত যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তৎপরতা
একাধিক দায়িত্বের চাপ সামলেও উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ইউএনও নাঈমা খান এমন দাবি করেন।