মোঃ শাহজাহান বাশার,
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
শিক্ষা এবং সংস্কৃতি একটি জাতির প্রাণশক্তি। দুটি একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানার্জন করে, চিন্তাশীল হয়ে ওঠে, দক্ষতা অর্জন করে এবং সমৃদ্ধ জীবনের পথে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের আবেগ ও মূল্যবোধের প্রতিফলন। যখন একটি জাতি শিক্ষিত হয় এবং তার সংস্কৃতির প্রতি সচেতন হয়, তখন সে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক আরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা শুধু স্বাধীনতা লাভ করি নি, আমরা আত্মপরিচয়ও ফিরে পেয়েছি। সেই পরিচয়ের মূল স্তম্ভ হলো আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার চেতনায় ভরা জনসাধারণ। শহীদ ভাষা ও সাহিত্যের কাণ্ডকীর্তি প্রমাণ করে, একটি জাতি যখন তার শিক্ষার আলো ও সাংস্কৃতিক মূল্যে বিশ্বাস রাখে, তখন সে কোনো শক্তির কাছে হেরে যায় না।
শিক্ষা কেবল বই পড়ার নাম নয়। এটি হলো মননশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ। একজন শিক্ষিত মানুষ নিজের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়। সে শুধু নিজেকে সমৃদ্ধ করে না, সমাজকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। দেশের উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, শিল্প এবং ব্যবসায় অগ্রগামী করতে সহায়ক।
অন্যদিকে সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মা। নৃত্য, সঙ্গীত, নকশা, লোকগীতি, নাটক, চিত্রকলা—এগুলো আমাদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির প্রকাশ। সংস্কৃতি আমাদের শেখায় সহমর্মিতা, সহানুভূতি এবং সামাজিক সমন্বয়। আমাদের মাটির গান, লোকনৃত্য, উৎসব এবং ঐতিহ্য প্রতিনিয়ত নতুন প্রজন্মকে আমাদের ইতিহাস ও পরিচয় স্মরণ করিয়ে দেয়।
কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে অনেক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বই ও পড়াশোনার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় বেশি ব্যয় হচ্ছে। বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে হ্রাস করছে। আমাদের শিশু ও যুবসমাজ যেন জাতীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য জরুরি, আমরা যেন সমন্বিতভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিবারে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক শিক্ষাও সমান্তরালভাবে দেওয়া প্রয়োজন। পাঠ্যবইয়ে শুধু বিজ্ঞান ও গণিত নয়, আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং নৈতিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুবসমাজকে তাদের উৎসব, গান, নৃত্য ও ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব।
একটি উন্নত জাতি গড়তে হলে আমাদের শিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের দরকার। আমাদের সন্তানরা যেন শুধু জ্ঞান অর্জন করে না, তারা যেন মানবিক মূল্যবোধে পরিপূর্ণ হয়। শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয় হলে একটি জাতি কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, মানসিক ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়।
শেষ কথা হলো—শিক্ষা ও সংস্কৃতি হলো দেশের অমোঘ শক্তি। যদি আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে পারি, তবে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি শিক্ষিত, সভ্য, এবং গৌরবময় জাতিতে পরিণত হবে। এই পথে জাতি যেমন অগ্রসর হবে, তেমনি আগামী প্রজন্মও আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গৌরব ধারণ করবে।