হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি :
তানোর ও গোদাগাড়ী—এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী–১ (৫২) সংসদীয় আসন। রাজনৈতিক, ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও ভোটের জটিল সমীকরণের কারণে আসনটি বরাবরই ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারণা এখন তুঙ্গে। এবার রাজশাহী–১ আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট পাঁচ জন প্রার্থী। তাঁরা হলেন—
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. শরিফ উদ্দীন — ধানের শীষ প্রতীক।জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান — দাঁড়িপাল্লা প্রতীক
গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী মীর মো. শাহজাহান — ট্রাক প্রতীক।আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান — ঈগল প্রতীক
স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আল সাআদ — মোবাইল ফোন প্রতীক
তবে মাঠের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীর মধ্যেই।
সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর ভোটেই ভরসা
তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। বিশেষ করে গোদাগাড়ী উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। অতীতের বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই জনগোষ্ঠীর ভোট রাজশাহী–১ আসনের জয়–পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে এবারের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই এই ভোটারদের সমর্থন পেতে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধান দুই দলের জয়–পরাজয়ের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর ভোটাররা। সেই সঙ্গে তরুণ ভোটাররাও এই আসনের সমীকরণে বড় একটি ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর ভোটারদের কাছে টানতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই নানা কৌশল অবলম্বন করছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই জনগোষ্ঠীর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এদিকে সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বী ও ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর কিছু নেতা জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় উপস্থিত হয়ে প্রকাশ্যে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপিও মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। দলটির নেতাকর্মীরা পাড়া–মহল্লা, হাট–বাজার ও গ্রামীণ জনপদে নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাকি তিন প্রার্থীর তেমন দৃশ্যমান প্রচারণা নেই। তাঁদের সাংগঠনিক শক্তিও তুলনামূলকভাবে দুর্বল বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
তবে এবি পার্টি মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুর রহমানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। বাস্তব মাঠের রাজনীতিতে ভোট ভাগাভাগির ক্ষেত্রে তাঁদের প্রভাব খুব একটা জোরালো হবে না বলেই মনে করছেন অধিকাংশ ভোটার ও বিশ্লেষক। ফলে সামগ্রিকভাবে রাজশাহী–১ (তানোর–গোদাগাড়ী) আসনে প্রধান লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী মো. শরিফ উদ্দীন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মধ্যেই—এমন ধারণাই এখন ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
রাজশাহী–১ আসনটি ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে এলাকায় দলটির শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের তেমন দেখা যাচ্ছে না।
নিষেধাজ্ঞার আগে ও পরবর্তী সময়েও এলাকায় আওয়ামী লীগের কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপি যেমন মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে, তেমনি শুরু থেকেই নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
বিশাল ভৌগোলিক এলাকা ও জটিল ভোটের সমীকরণ
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী–১ সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে—
পুরুষ ভোটার : ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮ জন
নারী ভোটার : ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৯ জন
তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার : ৩ জন
এই আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৯টি।
প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী—
তানোর উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়ন,
গোদাগাড়ী উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন।
তানোর উপজেলার আয়তন ২৯৫ দশমিক ৪০ বর্গকিলোমিটার এবং গোদাগাড়ী উপজেলার আয়তন ৪৭৫ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার।
দুই উপজেলা মিলিয়ে মোট আয়তন দাঁড়ায় ৭৭০ দশমিক ৬৬ বর্গকিলোমিটার।
রাজশাহী–১ আসন দেশের সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে অষ্টম বৃহত্তম।বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও বিপুল ভোটারসংখ্যার কারণে এখানে ভোটের হিসাব বরাবরই জটিল। ফলে আগাম ফলাফল অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। রাত–দিন প্রচারণা, মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা
নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই বর্তমানে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। হাট–বাজার, গ্রাম, পাড়া–মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল এলাকায় দিন–রাত বিরামহীন গণসংযোগ ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা এবার উন্নয়ন ও জীবনের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন।
ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, যিনি—
কর্মসংস্থান সৃষ্টি,শিক্ষার উন্নয়ন,
কৃষি সমস্যার সমাধান—বিশেষ করে সার ও সেচের পানির সংকট দূরীকরণ,
রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন,ব্যবসা–বাণিজ্য সম্প্রসারণ,
সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার
এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের কার্যকর উদ্যোগ
নিতে পারবেন—তাঁকেই ভোট দিতে আগ্রহী সাধারণ ভোটাররা।
নির্ধারক ভূমিকায় সনাতন, ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটার
সব মিলিয়ে