লেখক: মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে দেশটি অর্জন করেছিলাম, সেই দেশে আজও মানুষের মনে শান্তি নেই, রাস্তায় নিরাপত্তা নেই, আর জীবনে স্থিতি নেই। রক্তপাত, চাঁদাবাজি, গুম, খুন, মারামারি—এ যেন আমাদের নিত্যদিনের খবর। প্রশ্ন জাগে, এই বাংলাদেশ কি সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ, যার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন? নাকি আমরা ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে হাঁটছি?
আজ যখন খবরের কাগজের পাতা উল্টাই বা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখি, দেখি রক্তে ভিজে থাকা শিরোনাম—কোথাও রাজনৈতিক সংঘর্ষ, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও নারী নির্যাতন, কোথাও গুম হয়ে যাওয়া নিরীহ মানুষ। এ যেন এক অন্তহীন শৃঙ্খল, যার শেষ নেই। কেন আমরা বারবার একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি? কেন আমরা শিখতে পারলাম না?
সমাজের এই অস্থিরতা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল আইন প্রয়োগ, রাজনৈতিক স্বার্থবাদিতা এবং একটি শক্তিশালী দোষী গোষ্ঠীর প্রভাব।
রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়: অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক ছায়ায় থাকে, তখন তারা আইনের বাইরে চলে যায়। ক্ষমতার সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়ে দাঁড়ায় তাদের বর্ম।
দুর্বল বিচার ব্যবস্থা: মামলার বছর পার হয়ে যায়, কিন্তু রায় আসে না। অপরাধী বারবার জামিনে বের হয়ে অপরাধ চালিয়ে যায়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও হতাশা থেকে জন্ম নেয় অপরাধপ্রবণতা। অনেক যুবক দ্রুত অর্থের লোভে অপরাধ জগতে ঢুকে পড়ে।
নৈতিক অবক্ষয়: পরিবার, শিক্ষা ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবনতি আমাদের এই অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে।
শুধু সরকারের দোষ দিয়ে দায়মুক্তি পাওয়া যাবে না। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সবাইকে এই অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাতে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা যদি নিজেকে বদলাতে না পারি, তাহলে দেশ বদলাবে কিভাবে?
আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রতিদিন অসংখ্য অপরাধের খবর দেখি ও লিখি। কিন্তু কখনও মনে হয় না যে, আগামীকাল পরিস্থিতি বদলে যাবে। আমার প্রশ্ন—যে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসে এখনো রক্তপাত ও সন্ত্রাস থামাতে পারেনি, সেই বাংলাদেশ কি আসলেই মুক্ত? নাকি আমরা কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু মানসিক ও সামাজিকভাবে এখনো বন্দী?
এখনই সময়—আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া ভেঙে দিতে হবে, নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। নইলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রেখে যাবো এক রক্তাক্ত, ভয়াবহ বাংলাদেশ, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করবে।