মোঃ শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
পৃথিবীর যে কোনো সমাজে শিশুরা প্রাথমিকভাবে অসহায় এবং সহজেই ভয়ভীত হয়ে পড়ে। ঠিক তেমনই বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় শৈশবে প্রত্যেক শিশুর মনে ভয়সংকেত তৈরি হয় কিছু প্রথাগত ও সাংস্কৃতিক কারণে।
লেখক গোলাম মাওলা রনি তার শৈশব স্মৃতি ভাগ করে বললেন, পাকিস্তানি সময়ের শেষ পর্যায়ে তিনি মাত্র তিন-চার বছরের বয়সে দাদির কাছে শোনেন এক ভয়ঙ্কর উক্তি—“দিয়ে ধন দেখে মন কাইড়া নিতে কতক্ষণ।” ছোট্ট বয়সে এমন শব্দের অর্থ পুরোপুরি না বুঝলেও তিনি দূর থেকে শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় গ্রামের শিশুদের মধ্যে হাজাম এবং খতনার বিষয়টি সবচেয়ে ভীতিকর ছিল। লেখক স্মরণ করেন, হাজাম আসলে শিশুদের গোপনাঙ্গ কেটে নেয়ার ঘটনা শিশুসমাজে শুধুই ভয় তৈরি করত।
লেখক বলেন, “আমার দাদির পরিবার অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। দাদির বাবা নামকরা জমিদার, আর এক চাচা পাকিস্তানি পুলিশের আইজি ছিলেন। পরিবারে সরকারি চাকরি, ব্যবসা ও রাজনীতিতে প্রভাবশালী সদস্য থাকায় গ্রামের লোকজন দাদির কাছে পরামর্শ নিতে আসত। কিন্তু শিশুর চোখে তখন এসব কিছুই রহস্যময় এবং ভয়ঙ্কর মনে হতো।”
রনি আরও উল্লেখ করেন, শৈশবের সেই ভয় ও আতঙ্ক আজকের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি দেখলে নতুনভাবে ফিরে আসে। দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিছিল, রাজনৈতিক নেতাদের হুমকি এবং জনগণের ওপর প্রকাশ্য চাপ সৃষ্টি—এই সব বিষয় তাকে অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, “মানুষ যখন ভয় পায়, তখন আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তাভাবনা ওলটপালট হয়ে যায়। কেউ বর্তমান বুঝতে পারে না, কেউ ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে পারে না। আমার নিজেও এমন ভয় ও আতঙ্কের কারণে দিনের বেলায় দামি জিনিস নিয়ে চলাফেরা করতেও ভয় পাই।”
লেখক দাদির শিক্ষার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। দাদি বলতেন, টাকা এত আকর্ষণীয় যে মাটির পুতুলও টাকা খেতে উদগ্র হয়ে ওঠে। আজকের সময়ে তিনি দেখছেন, এই শিক্ষা বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়—অনেক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল নিজের স্বার্থের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করছে, যা দেশের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
রনি বলেন, “রাজনীতিতে ব্লু ব্লাড থিওরি, অর্থাৎ সৎ, প্রভাবশালী ও নীল রক্তধারী পরিবার থেকে আসা ব্যক্তিরা দেশের জন্য নিরাপদ। অন্যদিকে দুর্বল ও স্বার্থপররা রাজকোষ লুণ্ঠন ও ক্ষমতার জন্য অন্যায় কাজ করে।”
শিশুকাল থেকে রাজনৈতিক সচেতনতা ও বাস্তবতার এ ধরনের পর্যবেক্ষণ লেখকের কাছে অতীত ও বর্তমানের সংযোগ স্থাপন করেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দেশের কিছু কার্যক্রম ও সংঘর্ষের প্রকাশ্য চিত্র সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করছে। তবে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন—শৈশবের ভয় ও শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
উপসংহার: শৈশবের স্মৃতি থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে দেখা গেলে বোঝা যায়—মানবিকতা, সততা এবং নৈতিকতা ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সম্ভব নয়।