শিহাব মিয়া, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় কৃষকদের মাঝে নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সহায়তা বিতরণের পরপরই উপকারভোগীদের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তালিকায় একাধিক ব্যক্তির নাম, পিতা কিংবা স্বামীর নাম এবং গ্রামের তথ্যে অসঙ্গতি থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ উপজেলার ১ হাজার ২৫ জন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারকে জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করছে। এর ধারাবাহিকতায় সোমবার (১২ মে ২০২৬) বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের উপকারভোগীর মধ্যে ১৪৪ পরিবারকে বিকাশের মাধ্যমে ক্যাশআউট চার্জসহ ৬০৪২ টাকা করে সর্বমোট ৮,৭০,০৪৮ টাকা ও ১১১ পরিবারকে নগদ ৬০০০ টাকা করে সর্বমোট ৬,৬৬,০০০ টাকা। প্রত্যেককে জনপ্রতি ৬০০০/- টাকা হিসেবে ধরে মোট ১৫,৩০,০০০ টাকা এবং ২৫ পরিবারের মাঝে ০১ বস্তা ( ২৫ কেজি ) গবাদি পশুর খাদ্য বিতরণ করা হয় সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ সহায়তা বিতরণ করা হয়।
তবে বিতরণ কার্যক্রম শেষে উপকারভোগীর একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তালিকাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। অভিযোগ ওঠে, তালিকায় একাধিক ব্যক্তির নামের সঙ্গে পিতা বা স্বামীর নামের মিল নেই এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ পড়েছে।
ভাইরাল তালিকায় দেখা যায়, নিশ্চিন্তপুর গ্রামের নিশিকান্ত সরকারের পিতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে “আরকান আলী”, জয়পুর গ্রামের রোজিনা খাতুনের স্বামীর নাম “ধীরেন্দ্র সরকার”, দীপক চন্দ্র সরকারের পিতার নাম “মমিন মেখ”, কাঁচম আলীর পিতার নাম “নগেন্দ্র চন্দ্র সরকার”। এছাড়া সত্য রঞ্জন সরকারের পিতার নাম “মো. আব্দুল মজিদ”, ঝনিক চন্দ্র সরকারের পিতার নাম “সহিদ আলী”, নওয়াগাঁও গ্রামের মো. শফিকুল ইসলামের পিতার নাম “নিত্যানন্দ সরকার” এবং রৌহা গ্রামের জয়নাল আবেদীনের পিতার নাম “পরিমল চন্দ্র সরকার” উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া বংশীকুন্ডা গ্রামের রূপ নাহারের স্বামীর নাম “জগদীশ সরকার” উল্লেখ থাকায় তালিকার তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির সঙ্গে মুসলিম নাম এবং মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে হিন্দু নাম যুক্ত হওয়ায় পুরো তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নের শিশুয়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক সুধিন সরকার বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ নিরঞ্জন সরকার, পিতা হেলাল মিয়া নামে একটি নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে, কিন্তু এই নামে আমাদের গ্রামে কোনো ব্যক্তি নেই। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া তালিকাভুক্ত কিছু ব্যক্তির পরিচয় ও তথ্য নিয়েও অসঙ্গতি রয়েছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ দেলোয়ার হোসেন জানান, তালিকাটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রস্তুত করা হয়নি। ইসলামের রিলিফ বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পরিষদের সদস্যদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তালিকায় থাকা ভুলগুলো তাঁর নজরে আসার পর তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তারা জানান, কম্পিউটারে তথ্য সংযোজনের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব ভুল হয়েছে।
উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে দায়িত্বে থাকা ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট অফিসার সোহানুর রহমান বলেন, আমরা স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তালিকার ভিত্তিতে সহায়তা বিতরণ করেছি। বিদ্যুৎজনিত সমস্যার কারণে বাইরের কম্পিউটারে কাজ করতে হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় কিছু নামের প্রিন্টিং ত্রুটি হয়েছে। তালিকায় কোনো ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত সঞ্জয় ঘোষ জানান, ইসলামি রিলিফ বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের উদ্যোগে এই তালিকা প্রস্তুত করেছেন, এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তালিকাটি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।