মো. শাহজাহান বাশার, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:
দেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তন, অন্যদিকে পুরনো অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতা। গণতন্ত্রের নবজাগরণ, বিচারহীনতার অবসান এবং মানুষের অধিকার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন যেমন তৈরি হয়েছে—তেমনি আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে: এই পরিবর্তনও কি শেষ পর্যন্ত পুরনোরই নতুন সংস্করণ হবে না?
গত বছরের ৫ আগস্ট কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়টায় জনআস্থা, গণআন্দোলন ও রাজনৈতিক চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটলেও—পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কারে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
সরকার বদলেছে, কিন্তু রাজনীতির চর্চায় কতটা বদল এসেছে? সমালোচকরা বলছেন—দলীয় সুবিধা, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব, ক্ষমতা কেন্দ্রিক কৌশল আজও দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিজেকে “জনগণের সরকার” বলে দাবি করলেও বাস্তবে প্রতিশ্রুত অনেক পরিবর্তন এখনো ধোঁয়াশায়।
একদিকে যেখানে সরকারবিরোধী মামলার একটি বড় অংশ প্রত্যাহার হয়েছে, সেখানে নতুন করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং সোচ্চার কণ্ঠগুলোর ওপর নজরদারি বেড়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ। মিডিয়ায় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক মাধ্যমে ভয়—এগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের লক্ষণ?
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছু অগ্রগতি হলেও বাজারমূল্য, ডলার সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের সংকট কাটেনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষকে পিঠ ঠেকে দেওয়ালে। বেকারত্ব এবং গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাইয়ের খবর প্রতিনিয়ত মন খারাপ করা বার্তা বয়ে আনছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লেও, আমাদের রপ্তানি কমছে। প্রবাসী আয় ভাটার টানে, অথচ অর্থ পাচার থেমে নেই। সাধারণ মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত টাকা বিদেশে পাচারকারীদের হাতে যাচ্ছে, যা দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।
টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে—গণমাধ্যমে এখনো স্বাধীনতা অনিশ্চিত। সাংবাদিক নির্যাতন, পেশাগত নিরাপত্তার অভাব, সম্পাদক অপসারণ, টিভি চ্যানেলের বার্তা প্রধানদের চাকরিচ্যুতি—সব মিলিয়ে এক অন্ধকার সময় পার করছে দেশের গণমাধ্যম।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি, সেটি কি কেবল রাজনৈতিক ফাঁকা বুলি? না কি জনগণের আশা–ভরসার সঙ্গে একটি নির্মম প্রহসন?
মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মামলা হলেও বিচার এখনো অনেকাংশে ধীর। পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া শত শত মামলা, সাবেক সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে হত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগ—সবকিছুই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করছে। তবে আশার কথা, অন্তত এবার তদন্ত এগোচ্ছে এবং জনগণের চাপ রয়েছে।
জবাবদিহি ছাড়া গণতন্ত্র শুধু খোলস। এই কথাটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। অথচ এখনো বহু জনপ্রতিনিধি ও আমলা আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যাচ্ছেন।
দেশের তরুণ সমাজ আজ বিভ্রান্ত। রাজনীতিতে আদর্শের ঘাটতি, শিক্ষায় মানসম্পন্ন রূপান্তরের অভাব, কর্মসংস্থান সংকট—সব মিলিয়ে তারা হতাশ। অথচ এই তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ। যদি এখনই তাদের জন্য এক সৎ, নিরাপদ, এবং স্বপ্নময় বাংলাদেশ তৈরি না হয়—তবে ভবিষ্যত অন্ধকার।
এক বছর পেরিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের। জনগণ চেয়েছিল জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দুর্নীতিমুক্ত নীতি, এবং ভয়মুক্ত মতপ্রকাশের পরিবেশ। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এসব কি আদৌ অর্জিত হয়েছে?
সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে বলতে হয়—বাংলাদেশের মানুষ অনেক কষ্ট সহ্য করে মুক্তির আশা করে। এখন সময় সেই আশা পূরণের। রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজসবার দায়িত্ব আজ আরও বেশি।
একটা কথা না বললেই নয়: “নতুন বাংলাদেশ” তখনই সত্যিকারের নতুন হবে, যখন মানুষের অধিকারে আর কোনো আপস থাকবে না।