মো. শাহজাহান বাশার
সংবাদপেশা শুধু তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের নাম নয়; এটি দায়িত্ব, সতর্কতা এবং আইনি জ্ঞানের সমন্বয়। একটি শব্দ, একটি ক্যাপশন কিংবা একটি ছবির ব্যাখ্যাই কখনো কখনো সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে আদালতের কাঠগড়ায়। তাই সাংবাদিকদের জন্য আইন—বিশেষ করে মানহানি আইন—জানা অপরিহার্য।
আইন ভাষায় ‘ইনোয়েন্ডো’ এমন এক ধরনের বক্তব্য বা ইঙ্গিত, যা সরাসরি মানহানিকর মনে না হলেও অন্তর্নিহিত অর্থে কারও সম্মান ক্ষুণ্ন করতে পারে। সাধারণ পাঠকের চোখে নিরীহ মনে হলেও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেটি ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে—আর এখানেই ঝুঁকি।
১৯২৯ সালের একটি ঐতিহাসিক মামলা সাংবাদিকতার পাঠ্যসূচিতে আজও আলোচিত। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী পত্রিকা ডেইলি মিররের একটি গসিপ কলামে মেক্সিকান আর্মির সাবেক জেনারেল ক্যাসিডির সঙ্গে এক নারীর ছবি প্রকাশ করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়—তারা শিগগিরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন। বাস্তবে তারা আগেই আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন।
এই ক্যাপশন ঘিরে সামাজিক আলোচনায় এমন ধারণা জন্ম নেয় যে, তারা দীর্ঘদিন বিয়ে ছাড়াই একসঙ্গে বসবাস করছিলেন। এতে ক্যাসিডির স্ত্রীর সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে—এই অভিযোগে তিনি মানহানির মামলা করেন। আদালত রায়ে বলেন, প্রকাশিত বক্তব্যে ‘ইনোয়েন্ডো’ রয়েছে এবং সেটি মানহানিকর প্রভাব ফেলেছে। ফলাফল হিসেবে ডেইলি মিররকে জরিমানা করা হয়—যা সে সময়ের হিসেবে বড় অঙ্ক।
অনেকেই মনে করেন, সত্য প্রকাশ করলেই মানহানি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আইন বলছে—শুধু সত্যতা যথেষ্ট নয়; সেটি **জনস্বার্থে** হতে হবে। অর্থাৎ, তথ্যটি সমাজ, রাষ্ট্র বা নাগরিক স্বার্থে প্রাসঙ্গিক কি না—এটি আদালত কঠোরভাবে যাচাই করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো সরকারি কর্মকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রীয় অর্থের অনিয়ম, কিংবা জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য—এসব জনস্বার্থের আওতায় পড়ে। কিন্তু কেবল কৌতূহল বা বিনোদনের খোরাক জোগানো তথ্য সাধারণত জনস্বার্থ নয়।
আইনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা রয়েছে—সৎ বিশ্বাসে দেওয়া মতামত। কোনো গণমাধ্যম যদি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করে, সেটি মানহানি হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে। তবে শর্ত আছে: এটি স্পষ্টভাবে মতামতহতে হবে, তথ্য নয় , বিষয়টি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট হতে হবে , মতামতটি যাচাইকৃত ও সত্য তথ্যের ভিত্তিতে হতে হবে,যুক্তিসঙ্গত যে কোনো ব্যক্তি এমন মতামত দিতে পারেন—এমন মানদণ্ড পূরণ করতে হবে
এই সীমারেখা অতিক্রম করলেই মতামত পরিণত হয় মানহানিতে।
দেশের গণমাধ্যমে তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রায়ই চাঞ্চল্যকর লেখা প্রকাশ পায়। গুজব, অনুমান কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর গল্প—এসব পাঠকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো জনস্বার্থ নয়। আদালত বারবার বলেছেন, ‘মানুষের আগ্রহ’ আর ‘জনস্বার্থ’ এক বিষয় নয়।
মানহানি মামলায় ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণের ভার পড়ে বিবাদীর ওপর—অর্থাৎ গণমাধ্যমের ওপর। সাংবাদিককে প্রমাণ করতে হয় যে প্রকাশিত তথ্য সত্য, নির্ভরযোগ্য এবং জনস্বার্থে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সংবাদের উৎস প্রকাশ করা যায় না, নথিপত্র পাওয়া কঠিন হয়, কিংবা সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই আইনি জ্ঞানের অভাব সাংবাদিককে দুর্বল করে দেয়।
আইন জানা মানে ভয় পাওয়া নয়; বরং নিরাপদে, সাহসের সঙ্গে সত্য প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া। মানহানি, গোপনীয়তা, আদালত অবমাননা—এসব বিষয়ে সচেতন থাকলে সংবাদ আরও দায়িত্বশীল হয়, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে এবং গণমাধ্যম নিজের অবস্থান শক্ত রাখতে পারে।
সংবাদপেশায় কলম যেমন শক্তিশালী, তেমনি আইনজ্ঞান সেই কলমের রক্ষাকবচ। এই রক্ষাকবচ ছাড়া সাংবাদিকতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি গণতন্ত্রও পড়ে অনিরাপদ অবস্থায়।