হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় রোপা আমনের ভরা মৌসুমে তীব্র সার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে ডিএপি সার না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি মূল্যে নির্ধারিত পরিমাণ সার কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ বাড়তি দাম দিতে রাজি হলেই অনেক দোকান থেকে চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। কৃষকরা মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহার করায় চাহিদা বেড়েছে এবং কিছু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ী এই সুযোগে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। তবে কৃষকদের দাবি, কৃষি বিভাগের এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। তাদের অভিযোগ, সঠিকভাবে সার মনিটরিং না থাকায় ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম নিচ্ছেন।
দোকানে দোকানে ঘুরেও মিলছে না ডিএপি
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিএপি, পটাশ ও ইউরিয়া নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে ডিএপি সারে।
কৃষক কিতাব বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে ডিএপি সার নেওয়ার জন্য এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছি। কিন্তু চাহিদামতো সার পাচ্ছি না। শুধু আমি নই, এলাকার প্রায় সব কৃষকই একই সমস্যায় পড়েছেন। দোকানিরা বলছেন, বরাদ্দ পাওয়া যায়নি, তাই সার নেই।”
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার আমশো মোড়ে সরকারি মূল্যে সার দেওয়া হয়েছে। সেখানে কৃষকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য পরিমাণ সার নিতে হয়েছে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়ায় জমিতে সময়মতো সার প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।
সরকারি দামে না থাকলেও বাড়তি দামে মিলছে
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে ডিএপি সার না মিললেও বেশি টাকা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই সার পাওয়া যাচ্ছে। তাদের দাবি, ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত দামের ডিএপি সার কোথাও কোথাও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে পটাশ ও অন্যান্য সার নিয়েও বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, রোপা আমন রোপণের সময় থেকেই সারের সংকট চলছে। এখন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের সময় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এটি এক ধরনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে করা হচ্ছে। ডিলাররা চাহিদামতো বরাদ্দ না পাওয়ার কথা বললেও কৃষকদের প্রশ্ন—উপজেলায় কত জমিতে আমন আবাদ হচ্ছে এবং কত পরিমাণ সার প্রয়োজন, সেই হিসাব কৃষি বিভাগের অজানা থাকার কথা নয়।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন কৃষকদের
কৃষকদের অভিযোগ, সার সংকট দেখা দিলেই কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়—কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করছেন। অতিরিক্ত ব্যবহার করায় বরাদ্দের তুলনায় চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু কৃষকদের দাবি, জমিতে সঠিক পরিমাণ সার প্রয়োগের বিষয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
কৃষকদের অভিযোগ, “সার সংকট দেখা দিলেই কৃষি দপ্তর অতিরিক্ত ব্যবহারের অজুহাত দেয়। অথচ উপজেলায় মোট কত জমিতে রোপা আমন আবাদ হচ্ছে এবং ওই জমিতে কত পরিমাণ ডিএপি, এমওপি ও ইউরিয়া প্রয়োজন—এ হিসাব কৃষি বিভাগের কাছে থাকার কথা।”
তাদের দাবি, কৃষকের প্রকৃত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আগেই প্রয়োজনীয় সার বরাদ্দ নিশ্চিত করা উচিত ছিল।
এমপির সঙ্গে বৈঠকেও উঠেছিল বাড়তি দামের বিষয়
সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সার ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় সভায় সারের বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত দাম না নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। প্রয়োজন হলে সার বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের আশ্বাসও দেওয়া হয়।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সভা ও আশ্বাসের পরও মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় তাদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
ডিলারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা
কামারগাঁ ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার বিকাশ ও বিএডিসি সার ডিলার জুয়েলের বিরুদ্ধে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
তাদের দাবি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই হবে না; প্রকৃত ঘটনা যাচাই করতে ডিলারদের গুদাম, বিক্রয় রেজিস্টার, বরাদ্দের পরিমাণ, উত্তোলন ও বিতরণের হিসাব এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।
উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির একাধিক ডিলার
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তানোর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা এলাকায় নয়জন বিসিআইসি সার ডিলার রয়েছেন। এছাড়া উপজেলাজুড়ে বিএডিসির আরও ২১ জন সার ডিলার রয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব ডিলার সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভর্তুকি মূল্যের সার বরাদ্দ পান।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন ও সুষ্ঠু বিতরণে কোথাও কোথাও অনিয়ম হচ্ছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় সার উত্তোলন না করে বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোকাম থেকেই বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দেখা এবং ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত মনিটরিং করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
‘মনিটরিং দুর্বল, সুযোগ নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা’
কৃষকদের অভিযোগ, সারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন। সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে কৃষক বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে সার কিনছেন। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ধানের ন্যায্য দাম না পেলে কৃষকের লোকসানের আশঙ্কাও বাড়ছে।
একজন কৃষক বলেন, “আমরা সার চাই, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঝামেলা করতে চাই না। সরকার যে দামে সার দিয়েছে, সেই দামেই সার চাই। কিন্তু দোকানে গিয়ে বলা হয় সার নেই। আবার বেশি টাকা দিলে ঠিকই সার পাওয়া যায়। তাহলে সার নেই, নাকি সরকারি দামে নেই—এটা কৃষি বিভাগকে খুঁজে বের করতে হবে।”
ডিলারদের বক্তব্য—চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কয়েকজন সার ডিলার জানিয়েছেন, কৃষকদের চাহিদার তুলনায় তারা পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছেন না। বরাদ্দ কম হওয়ায় একসঙ্গে অনেক কৃষক সার নিতে আসছেন এবং তখন লাইনে দাঁড়িয়ে সার বিতরণ করতে হচ্ছে।
এক ডিলার বলেন, “কৃষকের চাহিদা অনেক, কিন্তু সেই অনুপাতে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদামতো বরাদ্দ পেলে সার দিতে কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমানে অল্প বরাদ্দের বিপরীতে কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবাইকে একসঙ্গে সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, কৃষকের চাহিদা বিবেচনায় প্রয়োজনে কৃষি বিভাগের মৌখিক অনুমতি নিয়ে বাইরের এলাকা থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা কৃষকদের
কৃষকদের মতে, রোপা আমনের বর্তমান পর্যায়ে সময়মতো সার প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিএপি, পটাশ ও ইউরিয়া প্রয়োজন হয়। প্রয়োজনীয় সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধানের বৃদ্ধি ও ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষকদের দাবি, সার সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়বে না, কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারেন। এতে চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হবে।
কৃষকদের দাবি—অভিযান ও কঠোর মনিটরিং
সারের প্রকৃত সংকট আছে কি না এবং কোথায় কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে—তা যাচাই করতে দ্রুত ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতাদের গুদামে অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।
তাদের দাবি, প্রতিটি ডিলারের বরাদ্দ, উত্তোলন, মজুত ও বিক্রির হিসাব প্রকাশ্যে যাচাই করা হোক। সরকারি মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কৃষকদের ভাষ্য, “সার সংকট নেই” যদি কৃষি বিভাগের দাবি হয়, তাহলে বাজারে সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত সার নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি সত্যিই বরাদ্দের ঘাটতি থাকে, তাহলে দ্রুত অতিরিক্ত বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কৃষকদের মধ্যে সারের সুষম ও প্রয়োজনীয় ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, চলমান আমন মৌসুমে দ্রুত সার সরবরাহ স্বাভাবিক করে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় ডিএপি, এমওপি ও ইউরিয়া নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে সার ব্যবসায়ীদের অনিয়ম, মজুতদারি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে—এমনটাই দাবি তানোরের কৃষকদের।