• সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৭ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
স্পেনের দাপুটে লড়াইয়ে নীরব মেসিসহ পুরো আর্জেন্টিনা পুলিশের বিশেষ অভিযান সিলাম থেকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী লায়েক মিয়া আটক সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ি বার্ষিক পরিদর্শন করলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এনামুল হক সিসিক প্রধান নির্বাহীর নাম ব্যবহার করে প্রতারণা ঘুষের টাকা না পেয়ে মোটরসাইকেল চালককে ৬ হাজার টাকার মামলা তানোরে এডিপির আওতায় উপকারভোগীদের মাঝে সিলিং ফ্যান, চেয়ার-টেবিল ও সেলাই মেশিন বিতরণ গণমাধ্যমের দায়িত্ব: সত্য প্রকাশের সাহস ব্রাহ্মণপাড়ার জনবান্ধব ইউএনও মাহমুদা জাহানকে অশ্রুসিক্ত বিদায় কুমিল্লায় সাংবাদিক মোঃ শাহরিয়ার গাড়ির ব্যাটারি চুরি, সিসিটিভিতে ধরা পড়ল সন্দেহভাজন কারবালা ও আহলে বায়ত (আ.) শীর্ষক আলোচনা নিউইয়র্কে বক্তব্য রাখলেন হযরত শাহসুফি সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী

গণমাধ্যমের দায়িত্ব: সত্য প্রকাশের সাহস

Reporter Name / ২৩ Time View
Update : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা বিচার করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো সেই দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন, দায়িত্বশীল এবং সত্যনিষ্ঠ। রাষ্ট্রের তিনটি সাংবিধানিক স্তম্ভ—আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে বলা হয় “চতুর্থ স্তম্ভ”। কারণ জনগণের পক্ষে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, বৈষম্য কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রশ্নটি প্রায়ই তোলে একজন সাংবাদিক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে গণমাধ্যম কি সত্যিই তার সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে? নাকি দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে সত্য, নৈতিকতা ও জনস্বার্থ?

বর্তমান সময়ে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব। একটি মোবাইল ফোন থেকেই মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায় একটি খবর। এই গতি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জও। কারণ যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচারিত একটি ভুল তথ্য মুহূর্তেই সামাজিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক ক্ষতি কিংবা একজন নির্দোষ মানুষের সম্মান ধ্বংস করে দিতে পারে।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যক্তি নিজেকে সংবাদ পরিবেশক হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু সাংবাদিকতা কেবল ক্যামেরা হাতে ভিডিও ধারণের নাম নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে প্রতিটি তথ্য প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই, একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া পেশাগত বাধ্যবাধকতা। এই নীতিগুলো উপেক্ষা করলে সংবাদ আর সংবাদ থাকে না, তা গুজব কিংবা অপপ্রচারে পরিণত হয়।

গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একবার যদি জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তবে আধুনিক প্রযুক্তি, আকর্ষণীয় উপস্থাপনা কিংবা বড় প্রতিষ্ঠান—কোনোটিই সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে না। তাই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হতে হবে সত্য, নিরপেক্ষতা, মানবিকতা এবং জবাবদিহি।

সত্য প্রকাশ সব সময় সহজ নয়। অনেক সময় ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা নানা ধরনের হুমকির মুখেও সাংবাদিককে সত্য তুলে ধরতে হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাহসী সাংবাদিকতার কারণেই বহু দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এসেছে এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের পথ খুঁজে পেয়েছে। তাই সত্য প্রকাশের সাহস কেবল একটি পেশাগত গুণ নয়; এটি সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা।

তবে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ববোধেরও প্রয়োজন রয়েছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার নীতি নয়। তদন্ত চলাকালীন গুজবকে সত্য হিসেবে প্রচার করা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার মতো সংবাদ প্রকাশ সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সময়ে ভুয়া তথ্য বা *ফেক নিউজ* একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক ভিডিও, বিকৃত ছবি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা সাধারণ মানুষের জন্য সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন করে তুলছে। তাই শুধু সাংবাদিক নয়, পাঠক ও দর্শকদেরও তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোনো সংবাদ শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করা, নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসরণ করা এবং আবেগের পরিবর্তে তথ্যের ওপর নির্ভর করাই হতে পারে ভুয়া তথ্য প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

জনস্বার্থই সাংবাদিকতার সর্বোচ্চ লক্ষ্য। এমন সংবাদই প্রকৃত সংবাদ, যা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং সমাজকে সচেতন করে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, দুর্নীতি, সুশাসন ও মানবাধিকার—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশই গণমাধ্যমের প্রকৃত দায়িত্ব।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃতি সংবাদকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে হলুদ সাংবাদিকতা, ক্লিকবেইট শিরোনাম, যাচাইহীন তথ্য প্রকাশ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের অভিযোগও গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো পেশাগত নৈতিকতার কঠোর অনুসরণ।

শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতাবানদের প্রশংসায় নয়, সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে। সাংবাদিকের কলম কিংবা ক্যামেরা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতিয়ার নয়; এটি জনগণের আস্থার প্রতীক। আর সেই আস্থা রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, গুজবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।

সত্য কখনো কখনো অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সত্য প্রকাশের সাহসের কোনো বিকল্প নেই। গণমাধ্যম যখন সত্যের পাশে দাঁড়ায়, তখন শুধু একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় না—একটি সমাজ আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd