• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
সেন্টমার্টিন—নীল জল নিয়ে রাজনীতি অন্ধকারের শেষপ্রান্তে আলোর প্রত্যাশা: বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ও আমাদের করণীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে ৮০-এর দশকের লুক, যেভাবে এটি তৈরি করবেন চিলমারীতে ওয়ালটন প্লাজার আয়োজনে মৃত দুই ক্রেতার পরিবারকে আর্থিক সুবিধা হস্তান্তর সিলেটে চুরির অভিযোগে কিশোরীর কোমরে শিকল বেঁধে নির্যাতন, গ্রেপ্তার ৩জন আগামী ১২ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরীতে পথসভায় আসছেন পীর সাহেব চরমোনাই ৩০০ টাকার শার্ট ২০০ টাকা বলায় ঢাবির ২ শিক্ষার্থীকে মারধর, পরে ৫০ শিক্ষার্থীর পাল্টা হামলা ডিবির অ,ভি,যানে সিলেটে ই,য়া,বার বড় চালান জব্দ, আ,টক-৩ ​নাগেশ্বরীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ইয়াবাসহ ৪ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার; ১ কেজি গাজা উদ্ধার অপহরণের দুই দিন পর লেদা ক্যাম্পের কিশোরী উদ্ধার, পালিয়েছে অভিযুক্ত

সেন্টমার্টিন—নীল জল নিয়ে রাজনীতি

Reporter Name / ১৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সেন্টমার্টিনের নীল জল কখনো রাজনীতি বোঝেনি। ঢেউ কখনো কোনো দলের পতাকা বহন করেনি, সমুদ্র কখনো ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে মাথা ঘামায়নি।
সেন্টমার্টিনের নীল জল কখনো রাজনীতি বোঝেনি। ঢেউ কখনো কোনো দলের পতাকা বহন করেনি, সমুদ্র কখনো ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

মোঃ শাহজাহান বাশার

সেন্টমার্টিনের নীল জল কখনো রাজনীতি বোঝেনি। ঢেউ কখনো কোনো দলের পতাকা বহন করেনি, সমুদ্র কখনো ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে মাথা ঘামায়নি। নীল আকাশ জানে না কোন দল ক্ষমতায়, কোন দল বিরোধী। অথচ সেই নীল জল, সেই ছোট্ট দ্বীপ, তার প্রবাল, বালুকাবেলা আর চারপাশের সমুদ্রকে ঘিরে মানুষের পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও রাজনৈতিক আলোচনা। কেউ দেখছেন জাতীয় স্বার্থ, কেউ পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা, কেউ পর্যটনের সম্ভাবনা, কেউ স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়, আবার কেউ দেখছেন বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু এতসব আলোচনার ভিড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি যেন কখনো কখনো আড়ালে পড়ে যায়—আমরা সেন্টমার্টিনকে আসলে কীভাবে দেখতে চাই?

সেন্টমার্টিনকে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে তার পুরো পরিচয় পাওয়া যায় না। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশির বুকে বাংলাদেশের এই দ্বীপ প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। তার বালুচর, প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, জেলেদের জীবন, স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও প্রজন্মের স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে সেন্টমার্টিন একটি পূর্ণাঙ্গ জনপদ। পর্যটকের চোখে যেখানে এটি কয়েক দিনের ভ্রমণ, স্থানীয় মানুষের কাছে সেটিই জীবন ও জীবিকার ঠিকানা।

সেন্টমার্টিনে গিয়ে একজন পর্যটক যখন সূর্যাস্তের ছবি তুলছেন, তখন কোনো জেলে হয়তো সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে পরের দিনের জীবিকার হিসাব করছেন। আমরা যখন নীল জলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, তখন দ্বীপের মানুষ সেই সমুদ্রের ওপর নির্ভর করেই পরিবার চালান। এই পার্থক্যটি আমাদের মনে রাখা জরুরি। কারণ সেন্টমার্টিন শুধু আমাদের ভ্রমণের আনন্দ নয়; এটি বহু মানুষের জীবনযাত্রারও অংশ।

সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে মানুষ নিজের ক্ষুদ্রতাকে বুঝতে পারে। শহরের ব্যস্ততা, রাজনৈতিক উত্তাপ, ব্যক্তিগত অহংকার—সবকিছু যেন ঢেউয়ের শব্দে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়। সকালে সেন্টমার্টিন একরকম, দুপুরে আরেকরকম, আর সূর্য ডোবার সময় তার সৌন্দর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর যখন চারপাশে অন্ধকার নামে, তখন দূরের সমুদ্রের গর্জন আর আকাশের অসংখ্য তারা মানুষকে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীটা বুঝি এতটা ব্যস্ত হওয়ার কথা ছিল না।

কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরেও বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন আছে।

ভূগোল কখনো শুধু মানচিত্রের রেখা নয়। একটি দ্বীপের অবস্থান, তার চারপাশের সমুদ্র, সামুদ্রিক সম্পদ, পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা—সবকিছু মিলেই তার গুরুত্ব তৈরি হয়। সেন্টমার্টিনও এর বাইরে নয়। তাই দ্বীপটি নিয়ে আলোচনা হলে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, সমুদ্রসীমা, পরিবেশ এবং মানুষের জীবন-জীবিকা—সব বিষয়কেই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

এখানেই রাজনীতির প্রশ্নটি সামনে আসে।

রাজনীতি নিজে কোনো খারাপ শব্দ নয়। রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, পরিবেশের পক্ষে কথা বলতে পারে। সেন্টমার্টিন নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা, মতবিরোধ কিংবা প্রশ্ন তোলাও গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন তথ্যের চেয়ে স্লোগান বড় হয়ে ওঠে, বাস্তবতার চেয়ে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায় এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দলীয় বিভাজনের মধ্যে আটকে যায়।

সেন্টমার্টিন নিয়ে আমাদের আলোচনা তাই হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও বাস্তবমুখী।

কেউ যদি জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলেন, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে শুনতে হবে। কেউ যদি পরিবেশের সংকটের কথা বলেন, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কেউ যদি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

কারণ একটি দ্বীপকে রক্ষা করার অর্থ শুধু সেখানে পর্যটক কমিয়ে দেওয়া নয়; আবার পর্যটন বাড়ানোর অর্থও প্রকৃতিকে অসীম চাপের মধ্যে ফেলে দেওয়া নয়। প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত ভারসাম্য।

আমরা পর্যটন চাই, কিন্তু কেমন পর্যটন চাই—সেটিই বড় প্রশ্ন।

আমরা চাই সেন্টমার্টিনে মানুষ যাক, সৌন্দর্য দেখুক, স্থানীয় মানুষের ব্যবসা ও কর্মসংস্থান বাড়ুক। কিন্তু সেই পর্যটন যেন দ্বীপের পরিবেশকে ধ্বংস না করে। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, যত্রতত্র বর্জ্য, অতিরিক্ত শব্দ, অপরিকল্পিত স্থাপনা কিংবা পর্যটনের অতিরিক্ত চাপ যদি দ্বীপের স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে একসময় পর্যটনই নিজের আকর্ষণ হারাবে।

প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ভোগ করতে গিয়ে যদি আমরা প্রকৃতিকেই শেষ করে ফেলি, তবে আমাদের অর্জন কী?

আজ যে শিশুটি সেন্টমার্টিনের সৈকতে দাঁড়িয়ে নীল সমুদ্র দেখে মুগ্ধ হচ্ছে, তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি একদিন সেই সৌন্দর্য শুধু পুরোনো ছবিতে দেখতে পায়, তাহলে দায় কার?

প্রকৃতি আমাদের কাছে কোনো ভোগের বস্তু নয়। এটি উত্তরাধিকার। আমরা যেমন পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পেয়েছি, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার দায়িত্বও আমাদের।

তবে পরিবেশ রক্ষার আলোচনায় স্থানীয় মানুষকে ভুলে গেলে চলবে না। সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা এই দ্বীপের বাইরের কেউ নন। তারা এই ভূখণ্ডেরই মানুষ। তাদের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করেই যেকোনো নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কোনো সিদ্ধান্ত যদি স্থানীয় মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে, তাহলে তাদের মতামতও শুনতে হবে। কারণ বাইরে থেকে একটি দ্বীপকে যত সহজ মনে হয়, সেখানে বসবাসকারী মানুষের কাছে জীবন তত সহজ নয়।

একজন জেলের কাছে সমুদ্র শুধু নীল নয়—সমুদ্র তার রুটি-রুজি। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে পর্যটন শুধু বিনোদন নয়—এটি তার পরিবারের আয়ের উৎস। একজন স্থানীয় বাসিন্দার কাছে সেন্টমার্টিন শুধু দর্শনীয় স্থান নয়—এটি তার জন্মভূমি।

তাই সেন্টমার্টিন নিয়ে যে কোনো জাতীয় নীতিতে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে একটি ন্যায়সংগত ভারসাম্য তৈরি করা জরুরি।

আর এই জায়গাতেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

রাষ্ট্রকে একদিকে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নীতিমালা করতে হবে, আবার সেই উন্নয়ন যেন দ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় মানুষ যেন উন্নয়নের অংশীদার হন, সেটিও দেখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত, পরিবেশবিদদের গবেষণা, স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বাস্তবতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার।

কারণ সেন্টমার্টিন নিয়ে কোনো আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনবে না।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা হতে পারে। বিরোধী মত প্রকাশের সুযোগও থাকতে হবে। কিন্তু সেন্টমার্টিনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন কোনো বিভাজন তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে সত্য ও তথ্য হারিয়ে গিয়ে কেবল রাজনৈতিক উত্তাপটিই সামনে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অনেক সময় একটি বক্তব্যকে যাচাই না করেই ছড়িয়ে দিই। একটি ছবি, একটি ভিডিও কিংবা একটি মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু সেন্টমার্টিনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দায়িত্বহীন তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়; দেশপ্রেমের সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হয়।

সেন্টমার্টিন নিয়ে দেশপ্রেমিক হওয়া মানে শুধু বলা নয়—“এটি আমাদের।” বরং তার অর্থ হলো, এই দ্বীপকে কীভাবে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী রাখা যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা।

আমাদের মনে রাখতে হবে—সরকার বদলায়, রাজনৈতিক দল বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়, রাজনৈতিক স্লোগানও বদলায়। কিন্তু একটি দ্বীপের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেলে তাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভাঙা প্রবালকে আবার জীবন্ত করতে পারে না। কোনো প্রশাসনিক আদেশ হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যকে রাতারাতি ফিরিয়ে আনতে পারে না।

সুতরাং সেন্টমার্টিনের প্রশ্নে আমাদের রাজনীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার রাজনীতি।

এখানে বিজয়ী হবে কোনো দল নয়; বিজয়ী হবে বাংলাদেশ।

আমরা চাই না, রাজনৈতিক বিতর্কে কেউ হেরে যাক। আমরা চাই না, কোনো মতকে কণ্ঠরোধ করা হোক। বরং আমরা চাই, সব মতামত সামনে আসুক, বিশেষজ্ঞরা কথা বলুন, স্থানীয় মানুষ কথা বলুন, পরিবেশবিদরা কথা বলুন, পর্যটনসংশ্লিষ্টরা কথা বলুন এবং রাষ্ট্র সব পক্ষের যুক্তি শুনে একটি টেকসই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক।

সেন্টমার্টিন কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।কোনো সরকারের একার নয়।কোনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নয়।কোনো পর্যটকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়।

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের। তার নীল জল বাংলাদেশের।তার প্রবাল বাংলাদেশের।তার বালুকাবেলা বাংলাদেশের।তার জেলেদের স্বপ্ন বাংলাদেশের।তার মানুষের ভবিষ্যৎও বাংলাদেশের।

তাই সেন্টমার্টিন নিয়ে রাজনীতি যদি করতেই হয়, সেই রাজনীতি হোক বাংলাদেশের স্বার্থের রাজনীতি। এমন রাজনীতি হোক, যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে, কিন্তু প্রশ্নের ভিত্তি হবে তথ্য। মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রতি সম্মান থাকবে। উন্নয়নের কথা বলা হবে, কিন্তু প্রকৃতিকে বিসর্জন দেওয়া হবে না। পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হবে, কিন্তু স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকেও উপেক্ষা করা হবে না।

সমুদ্রের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষায় কোনো দলীয় স্লোগান নেই, নেই ক্ষমতার অহংকার। আছে শুধু ঢেউয়ের আসা-যাওয়া।

একটি ঢেউ আসে, তীরে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। তারপর আসে আরেকটি ঢেউ।

মানুষের ক্ষমতাও অনেকটা তেমনই—আসে, কিছু সময় থাকে, তারপর চলে যায়। ইতিহাসের পাতা বদলায়। কিন্তু প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে থেকে যায়। সেই প্রকৃতিকে আমরা কতটা সম্মান করছি, সেটিই একদিন আমাদের বিচার করবে।

সন্ধ্যার সেন্টমার্টিনে যখন সূর্য ধীরে ধীরে সমুদ্রের ওপারে হারিয়ে যায়, তখন চারপাশের সব রাজনৈতিক শব্দ যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। দূরে ঢেউ ভাঙে, বাতাসে নোনা গন্ধ, আকাশে অন্ধকার নামে। তখন মনে হয়—মানুষের এত বিভাজন, এত তর্ক, এত ক্ষমতার লড়াইয়ের পরও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সত্যগুলো কত সহজ।

একটি নীল সমুদ্র।একটি ছোট্ট দ্বীপ।আর একটি দেশের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

সেন্টমার্টিন আমাদের কাছে তাই শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়। এটি আমাদের প্রকৃতির সৌন্দর্য, আমাদের ভূগোলের অংশ, আমাদের মানুষের জীবন, আমাদের পরিবেশের সম্পদ এবং জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

এই দ্বীপকে নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। প্রশ্ন উঠবে, বিতর্ক হবে, নীতি নিয়ে মতভেদ থাকবে। সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন কখনো এমন জায়গায় না যায়, যেখানে রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের হিসাব করতে গিয়ে সেন্টমার্টিনের ভবিষ্যৎটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

কারণ রাজনীতির মঞ্চে হার-জিতের হিসাব বদলানো যায়।কিন্তু প্রকৃতির ক্ষত সবসময় সহজে সারানো যায় না।

সেন্টমার্টিনের নীল জল তাই আমাদের কাছে আজ এক নীরব প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—

আমরা কি শুধু এই নীল সৌন্দর্যকে নিয়ে কথা বলব, নাকি সত্যিই তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও নেব?

উত্তরটি কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কাছে নেই। উত্তরটি আমাদের সম্মিলিত বিবেকের কাছে।

আমরা যদি সত্যিই সেন্টমার্টিনকে ভালোবাসি, তাহলে তাকে নিয়ে শুধু আবেগ নয়—দায়িত্বশীলতাও দেখাতে হবে। শুধু ছবি নয়—পরিবেশের কথাও ভাবতে হবে। শুধু পর্যটন নয়—স্থানীয় মানুষের কথাও বলতে হবে। শুধু রাজনীতি নয়—জাতীয় স্বার্থের কথাও মনে রাখতে হবে।

কারণ একটি দ্বীপ হারিয়ে গেলে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হারায় না; হারিয়ে যায় একটি ভূগোল, একটি পরিবেশ, একটি জীববৈচিত্র্য, একটি জনপদ, মানুষের অসংখ্য স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি সম্ভাব্য পৃথিবী।

সেন্টমার্টিন তাই শুধু নীল জল নয়।সেন্টমার্টিন আমাদের দায়িত্ব।সেন্টমার্টিন আমাদের উত্তরাধিকার।সেন্টমার্টিন আমাদের বাংলাদেশ।

নীল জল নিয়ে রাজনীতি হোক—কিন্তু সেই রাজনীতি যেন শেষ পর্যন্ত নীল জলটাকেই বাঁচিয়ে রাখার রাজনীতি হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd