• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা ইতালিতে অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর হামলার অভিযোগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার দাবি আসন্ন ৫নং সুবিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী মোঃ পনিরুজ্জামান মোল্লার নিবাচনী অঙ্গীকার ঘোষণা নাগেশ্বরীর থানা পুলিশের অভিযান, ৪০ বোতল ইস্কাফ উদ্ধার নাগেশ্বরী উপজেলা ইসলামী আন্দোলনের নবগঠিত কমিটি প্রকাশ ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ‎ত্রি-মুখী ক্যাডেট মাদ্রাসায় ফল প্রকাশ, সনদ ও নগদ অর্থ বিতরণ এসএমপি পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের দক্ষিণ সুরমা থানা পরিদর্শন: ভোলায় পুলিশের বিশেষ অ্যাকশন: নগদ টাকাসহ ইয়াবা সিন্ডিকেটের ৬ সদস্য গ্রেফতার রাজশাহীতে দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে জামায়াতের মানববন্ধন কচাকাটায় পানিতে ডুবে দুই শি/শু/র মৃ/ত্যু

রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর আরেক পরিচয়—একজন সমাজসেবক মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর অনন্য পথচলা

Reporter Name / ১৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

মানুষের পরিচয় কখনো শুধু পদ-পদবি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়ের সঙ্গে মানুষের কিছু কাজ এমনভাবে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, যা তাকে পরিচিত করে তোলে অন্য এক নামে—মানুষের মানুষ হিসেবে। কেউ পরিচিত হন তাঁর নেতৃত্বে, কেউ সম্পদে, কেউ রাজনৈতিক অবস্থানে; আবার কেউ নিজের জীবনের অর্জনকে অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে ব্যয় করে হয়ে ওঠেন নিঃশব্দ এক আলোকবর্তিকা। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ, যাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় জায়গাটি দখল করে আছে সমাজসেবা, শিক্ষা ও মানুষের কল্যাণে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা।

রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে, সামাজিকভাবেও তিনি সক্রিয়। কিন্তু স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর পরিচয়ের পরিধি তার চেয়েও বিস্তৃত। দল-মতের বিভাজন, ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের দূরত্ব—এসবের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের পাশে থাকার যে চেষ্টা তিনি বছরের পর বছর করে আসছেন, সেটিই তাঁকে আলাদা করে চেনায়। তাঁর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, নিজের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেয়ে তিনি নিজের শেকড়ের মানুষ, শিক্ষার্থী, অসহায় পরিবার এবং এলাকার সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু করার পথটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামের সন্তান মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনপথ শুরু হয়েছিল খুব সাধারণ এক পরিবারে। জন্ম ১৯৬৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী এবং মা মোসাম্মাৎ আশেদা খাতুন চৌধুরীর ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রথম। তাঁর শৈশব কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন গ্রামীণ বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের জন্য সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না, জীবনের নিশ্চয়তা ছিল সীমিত। এর মধ্যেই মাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৭৪ সালে বাবাকে হারান তিনি। একটি পরিবারের জন্য বাবাকে হারানোর যে শূন্যতা, তা শুধু আবেগের নয়; অনেক সময় সেটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার সংগ্রামেরও সূচনা।

বাবার মৃত্যুর পর ছয় সন্তানকে নিয়ে মা আশেদা খাতুন চৌধুরী কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পরিবারের দায়িত্ব, সন্তানদের লেখাপড়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু সামলে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। পরিবারের অন্য সদস্য ও চাচাদের সহযোগিতাও সেই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানদের মধ্যে যে মূল্যবোধ তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল সততা, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতা। পরবর্তী জীবনে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে মনে হয়, শৈশবের সেই শিক্ষা তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত তৈরি করেছিল।

তাঁর পারিবারিক ইতিহাসেও মানুষের জন্য কাজ করার একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। তাঁর দাদা মরহুম সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে ধান্যদৌল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়। আবার তাঁর বাবা মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরীও ১৯৫৭ সালে দুর্গম রাঙামাটিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং নিজ এলাকার শিক্ষক নিয়ে গিয়ে সেখানে শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। ফলে শিক্ষা ও জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতার যে বীজ পারিবারিকভাবে রোপিত হয়েছিল, তা পরবর্তী প্রজন্মে আরও বিস্তৃত রূপ পেয়েছে।

এই পারিবারিক উত্তরাধিকারই হয়তো তাঁকে বুঝিয়েছিল—একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তাঁর নিজের জন্য অর্জিত অর্থ নয়; মানুষের কাজে লাগতে পারে এমন কিছু সৃষ্টি করে যাওয়াও জীবনের বড় অর্জন। সেই উপলব্ধিই পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

এই পথচলায় জীবনের প্রয়োজনে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৮৩ সালে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান কাতারে। প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর সেখানে থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে আবারও বিদেশমুখী হন। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ প্রবাসজীবন। প্রায় তিন দশকের এই জীবন কোনো আরাম-আয়েশের গল্প নয়; বরং শ্রম, ঘাম, অনিশ্চয়তা ও আত্মসংযমের গল্প।

নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকা সহজ নয়। সেখানে জীবনের বিভিন্ন সময়ে ট্যাক্সিক্যাব চালানো, ফাস্টফুডের কাজে যুক্ত থাকা, নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করাসহ নানা ধরনের পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। প্রবাসজীবনের শুরুতে কিংবা দীর্ঘ সময়জুড়েই তাঁর জীবন ছিল কঠোর পরিশ্রমনির্ভর। অনেক প্রবাসী যেখানে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে নিজের জন্য বাড়ি, সম্পদ ও স্থায়ী নিরাপত্তা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, সেখানে তাঁর জীবনের একটি ব্যতিক্রমী দিক ছিল—নিউইয়র্কে প্রায় তিন দশক কাটিয়েও নিজের নামে একটি বাড়ি গড়ে তোলাকে তিনি জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানাননি।

এটি নিছক সম্পদ না থাকার গল্প নয়; বরং অগ্রাধিকারের গল্প। তাঁর আয়ের একটি বড় অংশ দেশে ফিরে কীভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে তোলা যায়, দরিদ্র শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় কীভাবে সহায়তা করা যায়, এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কীভাবে উন্নয়ন করা যায়—এসব ভাবনাই তাঁর জীবনকে অন্যদিকে পরিচালিত করেছে বলে তাঁর কর্মকাণ্ড থেকে প্রতীয়মান হয়।

প্রবাসে থাকার কারণে পরিবার থেকেও তাঁকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকতে হয়েছে। স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনু এবং সন্তান নওশীন তাবাসসুম খান চৌধুরী ও ফারহান খান চৌধুরীকে দেশে রেখে জীবনের একটি বড় সময় কাটিয়েছেন বিদেশে। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে উপার্জন করা, নিজের প্রয়োজন সীমিত রাখা এবং সেই উপার্জনের একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা—এটি এমন এক ত্যাগ, যার মূল্য কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাঁর পরিবারও তাঁর এই সামাজিক কর্মকাণ্ডে সমর্থন দিয়েছে বলে জানা যায়।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান অবদানগুলোর একটি হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। নিজের বাবার স্মৃতিকে ধারণ করে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। যে মানুষটি শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছিলেন, তিনি পরবর্তী জীবনে বাবার নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে যেন নিজের ব্যক্তিগত শোককে একটি সামাজিক সম্পদে রূপ দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে এবং সেখানে বর্তমানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বলে জানা যায়।

১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আশেদা-জোবেদা ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। মা ও দাদির নামের সঙ্গে স্মৃতিকে যুক্ত করে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তাঁর পারিবারিক মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষা শুধু একটি নির্দিষ্ট ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন—তাঁর কর্মকাণ্ডে এমন একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়।

এরপর ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি তাঁর নিজের নাম বহন করলেও এর পরিসর ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়। হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী এবং প্রায় একশ শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে বলে জানা যায়। বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স এবং একটি বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ের পড়াশোনার সুযোগও রয়েছে।

একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজ। সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর নামে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। এখানে পাঁচ শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করছে বলে জানা যায়। একটি প্রত্যন্ত বা আধা-শহুরে অঞ্চলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা শুধু একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের এবং একটি প্রজন্মের মানসিকতা পরিবর্তনের সঙ্গেও যুক্ত।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুমু-রোহান চাইল্ড কেয়ার প্রি-ক্যাডেট কিন্ডারগার্টেন। ছোটদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানেও বর্তমানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে বলে জানা যায়। সব মিলিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ছয় হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে—যে সংখ্যা একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত উদ্যোগের পরিধি বোঝাতে যথেষ্ট।

তবে শুধু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই তাঁর কাজের শেষ কথা নয়। শিক্ষার মান ও ফলাফল নিয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছেন বলে জানা যায়। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন তালিকায় মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ধারাবাহিকভাবে সেরা দশের মধ্যে থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে পরীক্ষার ফলাফলও ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং আবদুল মতিন খসরু মহিলা ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের তথ্য এবং উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯৮ শতাংশ পাসের তথ্যও সামনে আসে। এসব সাফল্য শুধু একজন প্রতিষ্ঠাতার নয়; শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা এবং তার অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার পেছনে উদ্যোক্তার দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর সামাজিক কর্মকাণ্ড শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে আটকে নেই। ২০১০ সালে ব্রাহ্মণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণের জন্য তিনি এক বিঘা জমি দান করেন বলে জানা যায়। বর্তমান বাজারমূল্যে ওই জমির মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ করা হয়। একজন প্রবাসীর জন্য জমি দান করা হয়তো একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত; কিন্তু একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য জমি দান করার অর্থ হলো নিজের সম্পদকে এমন একটি কাজে উৎসর্গ করা, যার সুফল বহু মানুষ দীর্ঘদিন ভোগ করতে পারে।

তিনি নিজ অর্থায়নে দুটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছেন বলেও জানা যায়। মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থানের উন্নয়নেও তাঁর সহযোগিতা রয়েছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ফাউন্ডেশন, যার মাধ্যমে বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অবকাঠামো—মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

কিন্তু তাঁর সামাজিক পরিচয়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হয়তো অন্য জায়গায়—তিনি বিভাজনের বদলে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করেছেন। এর একটি আলোচিত উদাহরণ ব্রাহ্মণপাড়া শ্রী শ্রী কালীমন্দিরকে ঘিরে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি একসময় জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। সংস্কারের অর্থ জোগাড় করতে মন্দির প্রাঙ্গণের প্রায় শতবর্ষী একটি গাছ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়। গাছটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। খবর পেয়ে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী গাছটি এক লাখ টাকায় কিনে নেন। কিন্তু সেই গাছ নিজের জন্য নিয়ে না গিয়ে তিনি তা মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছেই ফিরিয়ে দেন।

এই ঘটনাটি অর্থের অঙ্কে হয়তো খুব বড় নয়; কিন্তু সামাজিক অর্থে এর তাৎপর্য অনেক বেশি। একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংকটে অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি পাশে দাঁড়ালে সেখানে অর্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে বলে জানা যায়। আর এখানেই তাঁর ‘দল-মতের ঊর্ধ্বে’ বা ‘সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য’ হওয়ার দাবিটির একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা শুধু বক্তৃতা দিয়ে তৈরি হয় না; সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই তার ভিত্তি তৈরি হয়।

তাঁর ক্ষেত্রে রাজনীতি রয়েছে, কিন্তু তাঁর সামাজিক কাজকে শুধু রাজনীতির আয়নায় দেখলে হয়তো পুরো মানুষটিকে দেখা যাবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হিসেবে পরিচিত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি তাঁর আস্থার কথা প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একজন সাধারণ সমর্থক ও কর্মী হিসেবেও নিজেকে দেখেন তিনি। কিন্তু তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি রাজনৈতিক পরিচয়ের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ নয়—এমনটাই তাঁর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উদাহরণ থেকে বোঝা যায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় নেই; দরিদ্র শিক্ষার্থীর বৃত্তি পাওয়ার আগে তার দলীয় পরিচয় যাচাই করার প্রয়োজন নেই; একটি হাসপাতালের সেবা নিতে আসা রোগীর ধর্ম বা মতাদর্শ দেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় না; আর একটি মন্দিরের জরুরি সময়ে পাশে দাঁড়ানোর অর্থও কোনো রাজনৈতিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ নয়। এই বাস্তবতার জায়গা থেকেই তাঁর সামাজিক পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় মানুষের কাছে একজন মানুষের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় দীর্ঘ সময়ের আচরণে। একদিনের কোনো অনুদান, একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিতি বা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে তা তৈরি হয় না। বছরের পর বছর একই এলাকার মানুষের সঙ্গে থাকা, তাঁদের সমস্যা দেখা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করা—এসব ছোট-বড় উদ্যোগ মিলেই একজন মানুষকে মানুষের কাছে পরিচিত করে। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের ভেতর থেকে এমন একটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার চিত্র পাওয়া যায়।

তাঁর জীবনে কয়েকজন মানুষের প্রভাব ও সহযোগিতার কথাও তিনি বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করেছেন। সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, আত্মীয় ও শুভাকাঙ্ক্ষী জাকির খান চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরী পিনুসহ অনেকেই তাঁর পথচলায় উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছেন বলে জানা যায়। মানুষের বড় কোনো উদ্যোগ কখনো একা গড়ে ওঠে না। একজন সামনে থাকেন, কিন্তু তার পেছনে থাকে পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোদ্ধা এবং একটি সমাজের সহযোগিতা।

তবু মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্পে সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে একটি প্রশ্ন—প্রবাসে প্রায় তিন দশক কাটিয়ে তিনি নিজের জন্য কী রেখে গেলেন?

নিউইয়র্কের জীবন তাঁকে একটি বাড়ি দিতে পারেনি—অথবা তিনি বাড়ি বানানোকে জীবনের প্রধান অর্জন হিসেবে বেছে নেননি। কিন্তু তাঁর গ্রামের মানুষ পেয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, মহিলা কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, লাইব্রেরি, স্বাস্থ্যসেবার জন্য জমি, শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সহায়তা। ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব করলে হয়তো এটি একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। কিন্তু মানুষের জীবনে প্রভাবের হিসাব করলে এর মূল্য অন্যভাবে নির্ধারণ করতে হয়।

প্রবাসজীবনের উপার্জন দিয়ে নিজের জন্য একটি বড় বাড়ি নির্মাণ করা সহজতর সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু তিনি নিজের জন্মভূমিতে এমন কিছু স্থাপনা তৈরি করার পথ বেছে নিয়েছেন, যেগুলোর দরজা তাঁর নিজের পরিবারের জন্যই শুধু নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্য খোলা। এই জায়গাটিই তাঁর জীবনের গল্পকে একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প থেকে সামাজিক দায়িত্বের গল্পে পরিণত করেছে।

একজন মানুষের জীবন কতটা সফল—তা কি তাঁর ব্যাংক হিসাব দিয়ে মাপা যায়? নাকি তিনি চলে যাওয়ার পর কতজন মানুষ তাঁর কাজের সুফল ভোগ করবে, তা দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেকের কাছে আলাদা হতে পারে। কিন্তু মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনযাত্রা অন্তত একটি বিষয় সামনে আনে—নিজের অর্জনকে অন্যের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যেও সাফল্যের একটি গভীর অর্থ রয়েছে।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর করিডোরে যে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন হাঁটে, তাদের অনেকেই হয়তো জানে না—একজন প্রবাসী মানুষ বিদেশের মাটিতে কত ঘণ্টা শ্রম দিয়ে, কতটা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে, তাদের জন্য এই সুযোগ তৈরি করেছেন। তারা হয়তো শুধু জানে, তাদের এলাকায় একটি কলেজ আছে, একটি স্কুল আছে, একটি মাদ্রাসা আছে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের পেছনে যে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ঘাম, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও ব্যক্তিগত ত্যাগ রয়েছে, সেটি হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একদিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এ কারণেই মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্প শুধু একজন প্রবাসীর গল্প নয়। এটি শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার গল্প। এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি বিদেশে গিয়ে নিজের জীবন গড়েছেন, কিন্তু নিজের শেকড়কে ভুলে যাননি। বরং দূরদেশে থেকেও বারবার ফিরে তাকিয়েছেন ধান্যদৌলের দিকে, ব্রাহ্মণপাড়ার দিকে, কুমিল্লার মানুষের দিকে।

আজকের সময়ে যখন ব্যক্তিগত অর্জনকে অনেক সময় সামাজিক সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়, তখন তাঁর পথচলা কিছুটা ভিন্ন বার্তা দেয়। সম্পদ থাকা এবং সম্পদ মানুষের কাজে লাগানো—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। নিজের জন্য ভবিষ্যৎ তৈরি করা প্রয়োজন, কিন্তু নিজের পাশাপাশি অন্যের ভবিষ্যৎ তৈরিতে অংশ নেওয়া একটি ভিন্ন ধরনের মানবিকতা।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর কর্মকাণ্ডের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ধারাবাহিকতা। তিনি একবার একটি প্রতিষ্ঠান করেছেন, তারপর থেমে যাননি। একটি স্কুলের পর মাদ্রাসা, এরপর কলেজ, মহিলা কলেজ, শিশুশিক্ষার প্রতিষ্ঠান; শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, লাইব্রেরি, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান; দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি—ক্রমে তাঁর উদ্যোগের পরিধি বেড়েছে। এই ধারাবাহিকতাই তাঁর কাজকে বিচ্ছিন্ন কিছু দানের তালিকা থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগে পরিণত করেছে।

তাঁর সামনে এখনো পথ বাকি। ভবিষ্যতে শিক্ষার মান আরও উন্নত করা, প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং সময়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করা—এসব বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে চান।

এই পরিকল্পনার গুরুত্ব এখানেই যে, একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যেমন কঠিন, সেটিকে ভালোভাবে পরিচালনা করে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়া আরও কঠিন। ভবন নির্মাণের পরও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হয়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পরিবেশ উন্নত করতে হয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হয় এবং নতুন প্রজন্মের প্রয়োজন বুঝতে হয়। তাঁর সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হতে পারে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তোলা।

জীবনের শুরুতে বাবাকে হারানো সেই পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রটি হয়তো কখনো ভাবেনি, একদিন তার নামে একটি কলেজ হবে, বাবার নামে একটি স্কুল হবে, মায়ের নামে একটি মাদ্রাসা হবে এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। বিদেশের মাটিতে ট্যাক্সি চালানো, ফাস্টফুডে কাজ করা কিংবা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে শ্রম দেওয়া সেই মানুষটির জীবনের গল্প শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।

তাঁর জীবনের দিকে তাকালে সবচেয়ে শক্তিশালী যে ছবিটি চোখে পড়ে, সেটি হলো—একজন মানুষ দূরদেশে থেকেও নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বরং দূরত্ব যত বেড়েছে, শেকড়ের প্রতি তাঁর দায়বোধ যেন আরও গভীর হয়েছে। প্রবাস তাঁর পরিচয়ের একটি অংশ; কিন্তু তাঁর পরিচয়ের শেষ কথা নয়। রাজনীতি তাঁর একটি পরিচয়; কিন্তু সেটিও তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত সেই মানুষটির, যিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে চলেছেন।

দল-মতের বিভাজনে ভরা সময়ে কোনো মানুষ যদি বিভিন্ন মত ও পরিচয়ের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে পারেন, সেটিও এক ধরনের সামাজিক অর্জন। আর যদি সেই সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয় শিক্ষা, চিকিৎসা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং এলাকার উন্নয়ন, তাহলে সেই পরিচয় আরও বিস্তৃত হয়। মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও তাঁর কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন উদাহরণ সেই বিস্তৃত সামাজিক পরিচয়ের কথাই সামনে আনে।

একজন সমাজসেবকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদক নয়। কোনো অনুষ্ঠানের মঞ্চে সম্মাননা গ্রহণও নয়। সবচেয়ে বড় পুরস্কার হতে পারে এমন একজন শিক্ষার্থীর মুখে হাসি, যে অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারত; এমন একটি পরিবারের স্বস্তি, যে চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছে; এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন ভবন, যেখানে শত শত শিশু ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে; কিংবা এমন একটি সম্প্রদায়ের কৃতজ্ঞতা, যারা সংকটের সময়ে অন্য সম্প্রদায়ের একজন মানুষের সহযোগিতা পেয়েছে।

এই অর্থে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর গল্পকে শুধু একজন প্রবাসীর সফলতার গল্প বললে কম বলা হবে। এটি ত্যাগের গল্প, শেকড়ের গল্প, শিক্ষার গল্প এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প। এটি এমন এক জীবনের গল্প, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গায় সামাজিক দায়িত্ব অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

নিউইয়র্কে প্রায় তিন দশক থেকেও নিজের জন্য একটি দালান তোলার গল্প নেই; আছে জন্মভূমিতে শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গল্প। নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবার গল্প আছে। নিজের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প আছে। আর আছে এমন একটি বিশ্বাস—মানুষের জন্য করা কাজই শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

হয়তো একদিন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী থাকবেন না। সময়ের নিয়মে মানুষ চলে যায়। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলের কোনো শ্রেণিকক্ষে তখনও পাঠ চলবে, কোনো কলেজে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ভর্তি হবে, কোনো বৃত্তির অর্থ পেয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তান তার পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, কোনো লাইব্রেরির দরজা খুলবে, কোনো অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পাবে। তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক স্মৃতি হয়তো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাবে, কিন্তু তাঁর তৈরি করা প্রতিষ্ঠান ও মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া প্রভাব তাঁকে অন্য এক অর্থে জীবিত রাখবে।

শেষ পর্যন্ত মানুষের পরিচয় তার মৃত্যুর পরই হয়তো সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন পদ থাকে না, রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না, ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাবও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। থেকে যায় কাজ। থেকে যায় মানুষের স্মৃতি। থেকে যায় একটি স্কুলের নাম, একটি কলেজের নাম, একটি ফাউন্ডেশনের নাম, একটি দানের গল্প কিংবা সংকটে পাশে দাঁড়ানোর কোনো মানবিক ঘটনা।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় পাঠ তাই হয়তো এটাই—জীবন শুধু নিজের জন্য গড়ে তোলার নাম নয়; জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে তার কিছুটা অন্যের জন্যও রেখে যেতে হয়। প্রবাসের শ্রম যদি জন্মভূমির শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলায়, ব্যক্তিগত সম্পদ যদি মানুষের চিকিৎসার কাজে আসে, আর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের সীমা পেরিয়ে একজন মানুষ যদি অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে সেই জীবন কেবল ব্যক্তিগত থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি সামাজিক গল্প।

আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনীতি নয়, পদ নয়, বিত্ত নয়; আছে একজন মানুষের দীর্ঘ ত্যাগ, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। সেই কারণেই রাজনীতি ও সামাজিক পরিচয়ের বাইরে মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর আরেকটি পরিচয় ক্রমেই বড় হয়ে ওঠে—তিনি একজন সমাজসেবক; এমন একজন সমাজসেবক, যাঁর পথচলার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লেখা হয়েছে নিজের জন্য নয়, অন্যের ভবিষ্যতের জন্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd