মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
জীবন একবারই আসে—এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মানুষকে নৈতিক, মানবিক ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করার এক অনন্য জীবনদর্শন হলো মাইজভাণ্ডারী দর্শন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই এই দর্শনের পথচলা।কবি যেমন বলেছেন—এমন জীবন তুমি করিবে গঠন,মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন। ঠিক তেমনি একটি অর্থবহ জীবন গঠনের শিক্ষা দেয় মাইজভাণ্ডারী দর্শন, যেখানে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা দোয়া করতে শিখিয়েছেন—হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন।”এই দোয়ার বাস্তব প্রয়োগই যেন মাইজভাণ্ডারী দর্শন মাইজভাণ্ডারী দর্শনের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের পথ অনুসরণ—নবী, রাসূল, সিদ্দিক, শহীদ, মুমিন, মুত্তাকি ও আউলিয়া কেরামের জীবনাদর্শ। এই পথেই রয়েছে মুক্তি ও কল্যাণের নিশ্চয়তা।এই দর্শনের প্রবর্তক আউলাদে রাসূল (সা.), খাতেমুল আউলিয়া হযরত মাওলানা শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)—যাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আজও লাখো মানুষের জীবন পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা।
নৈতিকতা ছাড়া মানুষ পশুর সমতুল্য—এমন কঠোর সত্যই তুলে ধরে মাইজভাণ্ডারী দর্শন। সততা, সদাচার, শালীনতা ও সুন্দর চরিত্র গঠনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেন হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.)।
তিনি বলতেন—কবুতরের মতো বাছিয়া খাও, হারাম খাইও না।”
সমাজে অস্থিরতার মূল কারণ বিচারহীনতা ও বৈষম্য। মাইজভাণ্ডারী দর্শন ‘আদলে মোতলক’ বা পূর্ণ বিচারসাম্যের কথা বলে। এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগে কাজ করছে“শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) ট্রাস্ট”
এবং সারাদেশে বিস্তৃত মাইজভাণ্ডারী গাউসিয়া হক কমিটি, যারা দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবকল্যাণে নিরলস ভূমিকা রাখছে।
নজরুলের ভাষায়—মানুষ করিবে মানুষের সেবা, আর বাকি সব বাজে।”এই মানবিক দর্শনের বাস্তব রূপ ছিলেন হুজুর গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) নিজেই। অভাবী প্রতিবেশী, খাদেম ও কর্মচারীদের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ভালোবাসা আজও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পরমুখাপেক্ষিতা মানুষকে অবমাননার পথে ঠেলে দেয়। তাই মাইজভাণ্ডারী দর্শন আত্মনির্ভরশীল জীবন গঠনের আহ্বান জানায়।হুজুর (ক.) বলতেন—“নিজের হাতে পাকাইয়া খাও, পরের হাতে খাইও না।”এটি মাইজভাণ্ডারী ‘উসুলে সাবআ’ বা সপ্তকর্ম পদ্ধতির প্রথম ধাপ।অন্যের দোষ খোঁজা সমাজে অশান্তি ডেকে আনে। মাইজভাণ্ডারী দর্শন অন্যায় কাজের প্রতিবাদ ব্যতীত পরদোষ পরিহার ও নিজের দোষ সংশোধনের শিক্ষা দেয়।অছিয়ে গাউসুল আযম হযরত শাহসুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) বলেন—“পরদোষ পরিহারে নিজ দোষ ধ্যানে।”মানুষের কু-প্রবৃত্তি ধ্বংস করে সু-প্রবৃত্তি জাগ্রত করাই মাইজভাণ্ডারী দর্শনের অন্যতম লক্ষ্য।হুজুর (ক.) বলতেন—“ফেরেশতা কালেব বনিয়া যাও।”
ধৈর্যই সফলতার চাবিকাঠি। কঠিন দুঃসময়েও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেন মাইজভাণ্ডারী মনীষীগণ। এটি সপ্তকর্ম পদ্ধতির চতুর্থ ধাপ।মাইজভাণ্ডারী দর্শনে সমালোচক শত্রু নয়, বরং আত্মশুদ্ধির সহায়ক বন্ধু।সমালোচনার মাধ্যমে নিজের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।লোভ ও ভোগবাদ সমাজ ধ্বংস করে। তাই মাইজভাণ্ডারী দর্শন কামনা-লালসাহীন, সহজ-সরল ও নির্বিলাস জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়—যা আত্মিক উন্নতির শেষ ধাপ হিসেবে বিবেচিত।
মাইজভাণ্ডারী দর্শনের সারকথা হলো খোদা প্রেম—স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। এই প্রেমের পথেই ইহকাল ও পরকালের চূড়ান্ত কল্যাণ নিহিত।মাইজভাণ্ডারী দর্শন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নয়—এটি সর্বজনীন মানবকল্যাণের দর্শন। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগই পারে একটি নৈতিক, শান্তিময় ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে।
ইনশাআল্লাহ—আমাদের জীবন হোক কল্যাণময়,পরিবার হোক সুখময়,সমাজ হোক শান্তিময়,রাষ্ট্র হোক শৃঙ্খলাময়,
এবং পরকাল হোক মঙ্গলময়।আমিন।