আজিজুল গাজী জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু হতাশাজনকই নয়—বরং ভয়াবহ উদাসীনতার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র যখন বারবার শিক্ষাকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সেই শিক্ষার প্রধান উপকরণ পাঠ্যবইয়ের মান এভাবে নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা প্রশ্ন তোলে নীতিনির্ধারকদের আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে।
বিশেষ করে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে হোয়াইটপ্রিন্ট বাদ দিয়ে নিম্নমানের নিউজপ্রিন্ট ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ভুল বা সাময়িক ঘাটতির ফল নয়। এটি একটি পরিকল্পিত অবহেলা, যা সরাসরি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এই সিদ্ধান্তের দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দরপত্রে মানের শর্ত, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর দরপত্রে কাগজের মান সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দরপত্র অনুযায়ী পাঠ্যবই ছাপাতে শতভাগ ভার্জিন পাল্প ব্যবহারের শর্ত থাকলেও বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ রিসাইকেলড পাল্প।
এছাড়া পাল্পের জিএসএম (GSM), ব্রাইটনেস, বার্স্টিং ফ্যাক্টর ও অপাসিটির মতো মৌলিক মানদণ্ড একের পর এক লঙ্ঘন করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে, এখানে শুধু মান নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়নি—বরং সেটিকে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, বই ছাপার আগে মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কি আদৌ তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন? নাকি সবকিছু জেনেও চুপ থেকেছেন?
শিশুদের হাতে নিম্নমানের বই: শিক্ষা নাকি ঝুঁকি?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই নিম্নমানের বই সরাসরি শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। খসখসে কাগজ, ঝাপসা ছাপা ও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা শুধু বইয়ের সৌন্দর্যই নষ্ট করছে না, বরং শিক্ষার্থীদের পড়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম ব্রাইটনেস ও কম অপাসিটির কাগজ চোখের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে। অর্থাৎ এই অব্যবস্থাপনা শুধু শিক্ষার মানের প্রশ্ন নয়—এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও জড়িত একটি গুরুতর ইস্যু।
মুদ্রণকারী প্রেস ও তদারকির ব্যর্থতা
এক্ষেত্রে মুদ্রণকারী প্রেসগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। নির্ধারিত মান না মেনে বই ছাপা হলে সেগুলো কীভাবে গ্রহণযোগ্য হলো? কেন ইউভি কোটিংয়ের মতো মৌলিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বইয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে?
প্রায় সব বইতেই ইউভি কোটিং না থাকা প্রমাণ করে—এখানে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের কথা ভাবা হয়নি। বরং খরচ কমিয়ে লাভের হিসাব ঠিক রাখাই ছিল মুখ্য লক্ষ্য।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতির দায় কে নেবে?
এই পুরো পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমরা শিক্ষার কথা অনেক বলি, কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কী করছি, তা নিয়ে খুব কমই ভাবি। লাভের হিসাব হয়তো মিলেছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতির হিসাব কেউই করেনি।
মানসম্মত পাঠ্যবই শুধু একটি ছাপানো কাগজ নয়—এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়ে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখা নিছক ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।
এখনই প্রয়োজন জবাবদিহি ও কঠোর ব্যবস্থা
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে প্রয়োজন—
পাঠ্যবইয়ের কাগজ ও ছাপার মান পুনরায় পরীক্ষা
দায়ী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্মত বই নিশ্চিত করা
না হলে “শিক্ষাকে অগ্রাধিকার” দেওয়ার সরকারি বক্তব্য কেবল প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে নয়।
আপনি চাইলে আমি এটিকে