মোঃ শাহজাহান বাশার
রাজনীতিতে চাটুকারিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই তেলবাজির রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সত্য, নৈতিকতা ও যোগ্যতা প্রায় নির্বাসিত। সম্প্রতি ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের একটি সংসদীয় বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
লোকসভায় দাঁড়িয়ে লালুপ্রসাদ যাদব কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে উদ্দেশ করে যে ব্যঙ্গাত্মক সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, তা মূলত আধুনিক গণতন্ত্রে চাটুকার শ্রেণির ভয়াবহতা উন্মোচন করে। তিনি ‘টিটিএমপি’ শব্দটি ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছিলেন—তেল তোড়কে মালিশ পার্টি, যারা ক্ষমতার আশপাশে ঘুরে বেড়িয়ে নেতা ও রাষ্ট্র উভয়ের সর্বনাশ ডেকে আনে। প্রথমে সংসদ সদস্যরা শব্দটির অর্থ বুঝতে না পারলেও পরে লালুর ব্যাখ্যায় পুরো সংসদ হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক নির্মম রাজনৈতিক সত্য।
এই বাস্তবতা শুধু ভারতের নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও স্বাধীনতার পর থেকে চাটুকারদের দাপট ক্রমাগত বেড়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্র যত সংকুচিত হয়েছে, তেলবাজির পরিসর তত বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে রাজনীতির গুণগত মান যেমন নষ্ট হয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাময় নেতৃত্বও ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
চাটুকারিতার এই সর্বনাশা চরিত্র বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। প্রাচীন ভারতের সম্রাট হর্ষবর্ধনের দরবারের ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জওয়াহেরলাল নেহরু তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—সম্রাট হর্ষবর্ধনের সভাকবি বানভট্ট ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান, কিন্তু একই সঙ্গে চাটুকারিতার ফাঁদে জড়িয়ে পড়া এক বিপজ্জনক চরিত্র। সম্রাটের কাব্যপ্রতিভা জাহির করার নামে তিনি গোপনে নিজের লেখা কবিতা সম্রাটের নামে প্রচার করেন। এর ফলে রাজ্যজুড়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সত্য উদ্ঘাটিত হলে বানভট্টকে রাজদরবার থেকে বিতাড়িত করা হয়। তখনই সম্রাট উপলব্ধি করেছিলেন—চাটুকারই রাজার সবচেয়ে বড় বিপদ, অথচ রাজনীতি তাদের ছাড়া চলে না।
একই রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর। ইমাম গাজ্জালীর বর্ণনায় পাওয়া যায়—চাটুকারদের মিথ্যা প্রশংসায় অতিষ্ঠ হয়ে খলিফা একদিন এমন একজন আলেম খুঁজতে বলেছিলেন, যিনি নির্ভয়ে সত্য বলতে পারেন। সেই আলেম ওয়াসিল ইবনে আতা দরবারে এসে একে একে মদিনার গোত্রপ্রধান, গভর্নর এমনকি স্বয়ং খলিফাকেও নির্মম সত্যের আয়নায় দাঁড় করান। সত্য শুনে ক্ষুব্ধ হলেও খলিফা বুঝেছিলেন—দরবারে সত্য বলা মানুষই সবচেয়ে দুর্লভ।
এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যদি আমরা আজকের উপমহাদেশের রাজনীতি মিলিয়ে দেখি, তাহলে খুব বেশি বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। আজ রাজনীতিতে যারা সত্য বলার সাহস রাখে, তারা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। আর যারা তেল মাখাতে পারদর্শী, তারাই ক্ষমতার অলিন্দে স্থায়ী আসন পায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই চাটুকার সংস্কৃতি এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং কাঠামোগত সত্য। নেতা যত বড়, তেলবাজের সংখ্যা তত বেশি—এই অলিখিত সূত্রেই চলছে ক্ষমতার চক্র। এর ফল ভোগ করছে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
লালুপ্রসাদ যাদবের ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য, সম্রাট হর্ষবর্ধনের আত্মস্বীকৃতি কিংবা খলিফা মনসুরের তিক্ত অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে ইতিহাস আমাদের একটাই শিক্ষা দেয়:
চাটুকারিতা কখনো রাষ্ট্র গড়ে না, বরং ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভিত কুরে কুরে খেয়ে ফেলে।