মো. শাহজাহান বাশার,
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেল সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় ঘোষণা করেন। দেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিচার কার্যক্রম বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যা গোটা দেশসহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রায় ঘোষণার সময় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার দেখেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি রায়ের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে আশা প্রকাশ করেছেন—এ রায় কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর আত্মা শান্তি পাবে, দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, “ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় টিভিতে দেখেছেন এবং স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। জুলাই বিপ্লবে শহীদদের মামলায় শহীদরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। আদালতের রায়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ম্যাডাম বলেছেন, এতদিন যে অন্যায়, নির্যাতন ও নিপীড়ন দেশের জনগণকে সহ্য করতে হয়েছে, তার বিচার তিনি মহান আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটাবে এ রায়। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক মোড়।”
বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সহকারী এবিএম আব্দুস সাত্তার সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এখনও ম্যাডামের বাসায় যাইনি। তবে যেহেতু টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার হয়েছে, নিশ্চয়ই ম্যাডাম তা দেখেছেন। রায়টি দেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি না, তা জনগণ নিজেরাই মূল্যায়ন করবেন।”
গতকাল দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষে আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম এবং জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। আদালত কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণ জুড়ে উত্তেজনা, আবেগ ও স্বস্তির মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নজির সৃষ্টি করবে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া যে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা অবস্থানের ঊর্ধ্বে—এ রায় তারই প্রতীক।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন, “রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যারা জনগণের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।”
রায় ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ রায়কে স্বাগত জানাচ্ছেন, কেউ এর সমালোচনা করছেন। তবে যেসব পরিবার গত ১৭ বছর ধরে গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারহীনতার অভিযোগ করে আসছিলেন, তারা এই রায়কে দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, বিচারব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে বলে পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য। বিচার কার্যকর হবে কি না, কখন হবে—এ নিয়েও জনমনে নানা প্রকার আলোচনা চলছে। তবে আপাতত রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে শহীদ পরিবারদের।