জীবনে আমরা কত বই পড়ি, কত পৃষ্ঠা উল্টাই, কত গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হই, কত মানুষের চিন্তা-ভাবনা নিজের ভেতরে জায়গা দিই—তার হিসাব হয়তো আমরা নিজেরাও জানি না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কয়েক বছর পর সেই বইগুলোর অধিকাংশ তথ্যই আর আমাদের মনে থাকে না।
তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—তাহলে এত বই পড়ে লাভ কী?
এক ছাত্র একদিন ঠিক এই প্রশ্নটিই তার শিক্ষককে করেছিল। শিক্ষক সেদিন কোনো উত্তর দেননি। কয়েক দিন পর নদীর ধারে তিনি ছাত্রকে একটি ছিদ্রযুক্ত, ময়লা পাত্র দিয়ে বললেন—“যাও, নদী থেকে এই পাত্রে করে আমার জন্য এক পাত্র পানি নিয়ে এসো।”
ছাত্র জানত, ছিদ্রযুক্ত পাত্রে পানি ধরে রাখা সম্ভব নয়। তবুও শিক্ষকের কথা অমান্য করার সাহস হলো না। সে বারবার নদী থেকে পাত্র ভর্তি করে পানি আনতে চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই সব পানি ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ক্লান্ত ছাত্রটি শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের কাছে ফিরে এসে বলল, “আমি পারিনি।”
শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “তুমি ব্যর্থ হওনি। পাত্রটির দিকে তাকাও।”ছাত্র অবাক হয়ে দেখল—ময়লা পাত্রটি আগের চেয়ে অনেক পরিষ্কার, ঝকঝকে হয়ে গেছে।শিক্ষক তখন বললেন, “পানি পাত্রে থাকেনি ঠিকই, কিন্তু পানির প্রতিটি ফোঁটা পাত্রটিকে পরিষ্কার করে দিয়েছে। বই পড়ার ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটে।”
আমাদের মস্তিষ্কও যেন সেই ছিদ্রযুক্ত পাত্রের মতো। আমরা বই পড়ি, অসংখ্য তথ্য শিখি, গল্প পড়ি, ইতিহাস জানি, দর্শন বুঝি, মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হই। সময়ের সঙ্গে অনেক তথ্য ভুলে যাই। কিন্তু বইয়ের প্রভাব আমাদের ভেতর থেকে যায়।
কোনো একটি বই হয়তো আমাদের একটি বাক্য শিখিয়েছে।কোনো বই হয়তো আমাদের একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বাঁচিয়েছে।কোনো গল্প হয়তো আমাদের অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে।কোনো জীবনী হয়তো আমাদের ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আবার দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছে।কোনো কবিতা হয়তো আমাদের অনুভূতিকে নতুন ভাষা দিয়েছে।
আবার কোনো বই হয়তো আমাদের এমন একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা নিজেদেরই নতুন করে চিনেছি।
তাই বই পড়ার সবচেয়ে বড় সাফল্য সবকিছু মনে রাখা নয়; বরং বই পড়ে আগের মানুষটি না থাকা।
আজ যে মানুষটি একটি ভালো বই শেষ করল, আগামীকাল সে হয়তো একই মানুষ থাকবে না। তার চিন্তায় একটু পরিবর্তন আসবে, কথায় একটু পরিণত ভাব আসবে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি বাড়বে, ভুলকে স্বীকার করার সাহস জন্মাবে, সত্যকে দেখার চোখ আরও পরিষ্কার হবে।
বই আমাদের শুধু জ্ঞানী করে না; বই আমাদের মানুষ করে।আজকের পৃথিবীতে আমরা তথ্যের অভাবে ভুগছি না। বরং তথ্যের বন্যায় ভাসছি। মুঠোফোন খুললেই হাজার হাজার তথ্য, ভিডিও, ছবি, মতামত আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়।
তথ্য আমাদের জানায়—কী ঘটেছে।জ্ঞান আমাদের শেখায়—কেন ঘটেছে।আর প্রজ্ঞা আমাদের বুঝতে শেখায়—এ থেকে আমাদের কী শেখা উচিত।বই আমাদের সেই গভীরতার দিকে নিয়ে যায়।
একটি জাতির উন্নতির অন্যতম শক্তি তার পাঠাভ্যাস। যে ঘরে বই থাকে, সেখানে শুধু কাগজের পৃষ্ঠা থাকে না; সেখানে থাকে হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, ব্যর্থতা, সাফল্য ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
একটি শিশু যখন বই হাতে নেয়, তখন সে শুধু অক্ষর পড়তে শেখে না—সে পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শেখে।
একজন তরুণ যখন বই পড়ে, তখন তার সামনে নিজের জীবনের বাইরেও অসংখ্য জীবন খুলে যায়।
একজন বৃদ্ধ যখন বই পড়েন, তখন বয়সের সীমা পেরিয়ে তিনি নতুন পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলেন।
বই এমন এক বন্ধু, যে কখনো আপনার কাছ থেকে কিছু দাবি করে না; বরং নীরবে আপনাকে সমৃদ্ধ করে।
তাই সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য বই পড়াবেন না। তাকে বই পড়ান মানুষ হওয়ার জন্য।
তার হাতে শুধু মোবাইল দেবেন না, একটি বইও তুলে দিন।
তাকে শুধু সফল মানুষের গল্প শোনাবেন না, ব্যর্থ মানুষের গল্পও পড়তে দিন। কারণ সাফল্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, আর ব্যর্থতা মানুষকে পরিণত করে।
বাড়িতে একটি ছোট্ট বইয়ের তাক তৈরি করুন। সেখানে দামি বই না থাকলেও চলবে। কয়েকটি ভালো বই থাকুক। সন্তানকে বলুন—প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট বই পড়তে।
প্রথম দিকে হয়তো তার ভালো লাগবে না। কিন্তু অভ্যাস তৈরি হলে একদিন সে নিজেই বই খুঁজবে।
মনে রাখবেন, পাঠাভ্যাস একদিনে তৈরি হয় না; প্রতিদিনের কয়েকটি পৃষ্ঠা থেকেই তৈরি হয়।
আজ পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ুন। কাল দশ পৃষ্ঠা। এভাবেই একদিন দেখবেন, আপনি একটি বই শেষ করে ফেলেছেন। তারপর আরেকটি। তারপর আরেকটি।
হয়তো দশটি বই পড়ে আপনি নয়টি বইয়ের তথ্য ভুলে যাবেন। তবুও হতাশ হবেন না।
কারণ আপনি হয়তো তথ্যগুলো ভুলে গেছেন, কিন্তু বইগুলো আপনাকে যে মানুষ বানিয়েছে—সেটি আপনার আচরণে, চিন্তায়, সিদ্ধান্তে এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে থেকে যাবে।
বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা হয়তো আপনার স্মৃতিতে থাকবে না, কিন্তু তার কোনো না কোনো আলো আপনার ভেতরে থেকেই যাবে।
তাই আসুন, আমরা বইকে ভালোবাসি।নিজে বই পড়ি, সন্তানকে বই পড়াই, বন্ধুকে বই উপহার দিই। জন্মদিনে, বিশেষ দিনে কিংবা প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানানোর সময় ফুলের পাশাপাশি একটি বই উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলি।
কারণ ফুল কয়েক দিনের জন্য সৌন্দর্য দেয়, কিন্তু একটি ভালো বই কখনো কখনো একটি মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
বই জাতিকে শিক্ষা দেয়, আর বই থেকে শিক্ষা নেওয়া মানুষই একদিন জাতিকে পথ দেখায়।আজ একটি বই খুলুন।হয়তো আপনি বইটির সবকিছু মনে রাখতে পারবেন না।কিন্তু নিশ্চিত থাকুন—বইটি আপনাকে আগের মতো থাকতে দেবে না।আর মানুষের সবচেয়ে সুন্দর অর্জন হলো—প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের আগের সংস্করণকে ছাড়িয়ে যাওয়া। বই পড়ুন।নিজেকে জানুন।চিন্তাকে সমৃদ্ধ করুন।মানুষ হয়ে উঠুন।
লেখকঃ মোঃ শাহজাহান বাশার
সাংবাদিক ও কলামিস্ট