হামিদুর রহমান,তানোর (রাজশাহী)প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কামারগাঁ খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি (গুদাম কর্মকর্তা) আতিকুর রহমানকে সরকারি ধান সংগ্রহে অনিয়ম, বরাদ্দের ধান সংগ্রহ না করে অন্যত্র বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় এবং কৃষকদের সঙ্গে অসদাচরণের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা পারভীন।
(২৮ জুলাই) সকাল প্রায় ১০টার দিকে তার সাময়িক বরখাস্তের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে কামারগাঁ খাদ্য গুদামের সামনে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সময় অনেক কৃষক মিষ্টি বিতরণ করেন এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাদের দাবি, সংঘটিত অভিযোগের তুলনায় সাময়িক বরখাস্ত যথেষ্ট নয়; পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সূত্র ও কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে কামারগাঁ খাদ্য গুদামে সরকারিভাবে ৫৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে সরাসরি ধান কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কৃষক গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৩৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের পর অবশিষ্ট প্রায় ২০০ মেট্রিক টন ধান বিভিন্ন অজুহাতে সংগ্রহ না করে অন্যত্র বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বরাদ্দের ওই ধান গোপনে অর্থের বিনিময়ে এক ব্যবসায়ীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এ বিষয়ে এটিভি সংবাদ, দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন সংস্করণসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং তদন্ত শুরু হয়।
তদন্ত শেষে সরকারি ধান সংগ্রহে বিভিন্ন অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের পরিবর্তে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাইরের নিম্নমানের ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তারা দাবি করেন, প্রতি টনে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হয়। ফলে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কৃষক কার্ড ব্যবহার করে একটি চক্রের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য পরিচালিত হয়েছে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে কৃষক তালিকা, ধান সরবরাহকারী এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে দাবি স্থানীয়দের।
কৃষকদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার তদন্ত হলেও বিভিন্ন সময়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে তাদের ধারণা। তবে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, বরখাস্তের পর আতিকুর রহমান তার পরিবারের সদস্যদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গুদাম কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা পারভীন বলেন, “সরকারি ধান সংগ্রহে বরাদ্দের ধান সংক্রান্ত অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়ায় আতিকুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরবর্তী বিভাগীয় কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী চলবে।”
এদিকে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সাময়িক বরখাস্তে তারা সন্তুষ্ট নন। তাদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট সদস্যদেরও চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।