কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষের ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানি ও আটজনের আহত হওয়ার ঘটনার তদন্তে একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তির অবহেলা উঠে এসেছে। গত ২১ মার্চ রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে। জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি ১১ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দুর্ঘটনার পেছনের কারণ ও দায় নির্ধারণ করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পদুয়ার বাজার রেলগেইটের দায়িত্বে থাকা চার গেইটম্যানের মধ্যে দুইজন—মেহেদী হাসান ও হেলাল—দুর্ঘটনার সময় কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা ব্যক্তিগতভাবে এক হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য দুজনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এছাড়া বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দুই গেইটম্যান ট্রেন আগমনের পূর্ববার্তা দিতে ব্যর্থ হন। কললিস্ট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তারা কোনো সতর্কবার্তা প্রেরণ করেননি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার পদুয়ার বাজারে ফোন করে সতর্কবার্তা দেননি। একইসঙ্গে ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাস্টার প্রয়োজনীয় সংকেত না পেয়ে গতি কমাননি। অন্যদিকে, লেভেলক্রসিংয়ের নিকটে অবৈধ স্থাপনার কারণে দৃশ্যমানতা সীমিত থাকায় বাস চালক ট্রেন দেখতে পাননি। তবুও বাস চালক ঝুঁকিপূর্ণভাবে ক্রসিং অতিক্রম করেন এবং বিকল্প ওভারপাস ব্যবহার না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বাস মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ইতোমধ্যে তিন গেইটম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, দায়িত্বে অবহেলা, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মূল কারণ।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তদন্ত কমিটি আটটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে—
১. লেভেলক্রসিং গেইটের নিয়মিত মনিটরিং ও তদারকি জোরদার করা।
২. গেইটম্যানদের নিয়মিত ডোপ টেস্ট ও মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. সিগন্যাল লাইট ও সতর্ক ঘণ্টার বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল রাখা।
৪. গেইটম্যানদের জন্য স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
৫. সড়ক ও রেল কর্তৃপক্ষের সমন্বয় জোরদার করা।
৬. দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংক্রিয় রেল সিগন্যাল ও ব্যারিকেড স্থাপন।
৭. ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংয়ে বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা।
৮. বিআরটিএ’র নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, কিছু সংবেদনশীল তথ্য গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বহীনতা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলো এখনো বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি প্রত্যাশা করছে।