মোঃ শাহজাহান বাশার,
১৭ বছর পর দেশে ফিরে দায়িত্ব নিয়েই সক্রিয় তারেক রহমান; ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় গতি, মন্ত্রী-সচিবদের সময়ানুবর্তিতার নির্দেশ
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে সরকার গঠন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নতুন উদ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনতে তৎপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সচিবালয়কে কেন্দ্র করে তিনি শুরু করেছেন নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ঘোষণার বাস্তব রূপ দিতে সচিবালয়কেই কার্যত কমান্ড সেন্টার হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন থেকেই সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২০১ নম্বর কক্ষে অস্থায়ী কার্যালয়ে বসে দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথম কর্মদিবসেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার নির্দেশ দেন।
দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই টানা বৈঠক করেন তিনি। এনএসআই ও ডিজিএফআই মহাপরিচালক, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষভাবে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সচিবালয় সূত্র জানায়, তৃতীয় কর্মদিবসে সকাল ৯টা ৫ মিনিটেই অফিসে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি খোঁজ নেন কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা সময়মতো উপস্থিত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার মৌখিক নির্দেশনাও দেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিসে পৌঁছে কাজ শুরু করায় অনেক কর্মকর্তা বিস্মিত হন। এতে প্রশাসনে সময়ানুবর্তিতার একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন—প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যেন নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ১৮০ দিনের বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’, নদী-খাল-জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড চালু, সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠন এবং বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল সংক্রান্ত অগ্রগতি নিয়েও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার পর সচিবালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি প্রশাসনের প্রতি আস্থার বার্তা দেয়। অনেকেই মন্তব্য করছেন, নেতৃত্বের ধরনে তিনি তার পিতা জিয়াউর রহমান ও মাতা খালেদা জিয়া-এর কর্মশৈলীর প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।
শপথের পরদিন তিনি সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ-এ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং পরে জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভাষা শহীদ দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া মোনাজাতও করেন—যা অনেকের মতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত।
প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত উপস্থিতিকে ঘিরে সচিবালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন এবং প্রবেশপথে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়, খুব শিগগিরই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনে যাবেন প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘ ১৯ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করে সরকার গঠনের পর তারেক রহমানের প্রশাসনিক সক্রিয়তা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি যে কর্মমুখী প্রশাসন গড়ে তুলতে চান—তার প্রাথমিক ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচিবালয় এখন শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।