মোঃ শাহজাহান বাশার,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শিমুলঘর গ্রামে ইসলামী বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরী’র নির্ধারিত ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে জারি করা ১৪৪ ধারা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, “পরিকল্পিত বিভ্রান্তি” সৃষ্টি করে প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা যায়, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত কমিটির উদ্যোগে শনিবার (২৮ মার্চ) মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। আয়োজকদের দাবি, মঞ্চ নির্মাণ, প্যান্ডেল, সাউন্ড সিস্টেমসহ সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। তবে প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাহফিল বন্ধের তৎপরতা শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে ২৭ মার্চ শুক্রবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ বিন কাসেম এর স্বাক্ষরিত এক আদেশে এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হলেও স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি যথাযথ তদন্ত ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভুয়া পোস্টার বিতর্ক
অনুসন্ধানে জানা যায়, “নূরে মদিনা গাউছিয়া” নামে একটি পৃথক ব্যানারে একটি ওয়াজ মাহফিলের পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে। পোস্টারে যাদের সভাপতি ও বক্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের কেউই এ বিষয়ে অবগত নন বলে দাবি করেন।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা রোকন উদ্দিন সালেহী বলেন, আমার নাম ব্যবহার করে যে পোস্টার ছড়ানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
তিনি জানান, প্রকৃত মাহফিলটি আয়োজন করছেন মুফতি মুজাম্মেল হক মাসুমীর নেতৃত্বাধীন কমিটি, যেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল মুফতি গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর। প্রধান অতিথি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের থাকার কথা ছিল এবং সভাপতিত্ব করার কথা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন চৌধুরীর।
মাহফিল পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে মুফতি মুজাম্মেল হক মাসুমী বলেন, “একটি প্রভাবশালী মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আমাদের অনুষ্ঠান বানচালের চেষ্টা করছে। আমরা জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য কামাল মিয়া অভিযোগ করেন, “তাহেরী হুজুরের মাহফিল বন্ধ করতেই ভুয়া পোস্টারের নাটক সাজানো হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারির প্রয়োজন ছিল না।”
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি দাবি করেন, বিষয়টির পেছনে রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ-৪ আসনকে ঘিরে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এক মঞ্চে উপস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে অস্বস্তি ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউএনও জাহিদ বিন কাসেমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সম্ভাব্য সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা এড়াতেই প্রশাসন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার অনেকে এটিকে অপ্রয়োজনীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, “যে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সঠিক যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ।”
মাধবপুরের শিমুলঘর গ্রামে এ ঘটনার পর পরিস্থিতি এখনো শান্ত থাকলেও ১৪৪ ধারা জারিকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। স্থানীয়রা দ্রুত পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধান প্রত্যাশা করছেন।