মাগুরায় স্বপ্নবিলাসের পর এবার সবুজের বাসভবনে অভিযান,
নিজস্বপ্রতিবেদক,মাগুরা :
মাগুরা শহরের কলেজপাড়া এলাকার স্বপ্নবিলাস ভবনে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনার পর এবার এশিয়া মহিলা কলেজের পেছনে সবুজের বাসভবন থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবা,নগদ ৬ লাখ টাকা, একটি প্রাইভেটকার ও একটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় দীপ্ত কুমার বিশ্বাস ওরফে সুমনের স্ত্রী শম্পাকে আটক করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ঝিনাইদহে। শনিবার ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর আগে গত ৮ অক্টোবর রাতে কলেজপাড়ার স্বপ্নবিলাস ভবনে অভিযান চালিয়ে তাপসের ফ্লাট থেকে ২৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদক, নগদ টাকা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করেছিল এসআরবি-৬-এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প। দুই দফা অভিযানে মোট ৩২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মাগুরায় মাদক কারবারের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং এর সঙ্গে স্থানীয় কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জেলা জুড়ে। মাগুরা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, কুকনা এলাকায় এশিয়া মহিলা কলেজের পেছনে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় সবুজ নামের এক ব্যাক্তির বাড়ি থেকে ৪ হাজার পিচ ইয়াবাসহ একটি প্রাইভেট কার একটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল এবং নগদ ছয় লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলেজ পাড়ার স্বপ্নবিলাস ভবনে অভিযানের পর দীপ্ত ও তাঁর স্ত্রী সেখানকার বাসা ছেড়ে কুকনা এলাকায় এশিয়া মহিলা কলেজের পেছনে( শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা সবুজের) ক্রয় করা বাড়িটি ভাড়া নেন। বাড়িটিতে অপরিচিত ব্যক্তিদের যাতায়াত দেখে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে তাঁরা বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।এরপর শনিবার রাতে জেলা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ৪ হাজার পিস ইয়াবা, নগদ ৬ লাখ টাকা, ঢাকা মেট্রো-গ-১২-৮৯৯৪ নম্বরের একটি প্রাইভেটকার এবং একটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ সময় দীপ্তর স্ত্রী শম্পাকে আটক করা হয়।তবে নতুন বাসায় তাঁদের অবস্থান, উদ্ধার হওয়া মাদক ও অর্থের উৎস এবং আগের অভিযানের সঙ্গে সর্বশেষ ঘটনার যোগসূত্রের বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। গত ৮ অক্টোবর রাতে মাগুরা শহরের কলেজপাড়ার স্বপ্নবিলাস ভবনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় এসআরবি-৬-এর ঝিনাইদহ ক্যাম্প। র্যাবের অভিযানে ২৮ হাজার পিস ইয়াবা, চার বোতল ফেনসিডিল, নগদ ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টাকা, বিকাশে থাকা তিন লাখ টাকা,টাকা গণনার একটি মেশিন, চারটি ল্যাপটপ, দুটি ওয়াকিটকি, মুঠোফোন এবং ‘PRESS’ ও ‘ক্রাইম তালাশ’ লেখা মাইক্রোফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।এ ঘটনায় রাশেদ শেখ (৪১) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসআরবি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দীপ্ত কুমার বিশ্বাস ওরফে সুমন (৩৫)-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছিল। আগের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অর্থ উদ্ধারের কয়েক দিনের মধ্যে একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আলোচিত ব্যক্তির স্ত্রীর কাছ থেকে আবারও ইয়াবা ও নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দুটি অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদক, অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না,তা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মাদক কারবারের নেপথ্যে কারা?পরপর দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় মাগুরায় মাদক সরবরাহ ও বিতরণের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এত বিপুল পরিমাণ মাদক কোথা থেকে এসেছে, কারা সরবরাহ করেছে, অর্থের জোগানদাতা কারা এবং মাগুরায় মাদক মজুত ও পরিবহনে স্থানীয় কেউ সহযোগিতা করেছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। অন্য জেলা থেকে এসে কোনো ব্যক্তি বা চক্র মাগুরায় বাসা ভাড়া নিয়ে মাদক মজুত করে থাকলে তাদের স্থানীয় যোগাযোগ, অর্থের উৎস এবং সরবরাহব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আগের অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কীভাবে নতুন বাসায় অবস্থান নিয়েছেন এবং সেখানে কারা তাঁদের সহযোগিতা করেছেন, সে বিষয়েও অনুসন্ধান জরুরি। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থ, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মালিকানা এবং মাদক কারবারে এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিকলেনদেন, যোগাযোগের তথ্য ও মাদক সরবরাহের পথ বিশ্লেষণ করলে সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।স্বপ্নবিলাস ভবনে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন মাগুরা জেলা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও সাংবাদিক মিরাজ আহমেদ। এ ঘটনায় তিনি গত ১২ অক্টোবর সোমবার মাগুরা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নম্বর ৮৩৮ এবং ট্র্যাকিং নম্বর PWQ080। সাংবাদিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,স্বপ্নবিলাস ভবনে মাদক উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। নিজের নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি থানায় জিডি করেন।জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে তা উদ্বেগজনক। এ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে হুমকির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।মাদক কারবারের মতো অপরাধের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক যাতে হুমকি বা হয়রানির শিকার না হন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ ও পুলিশের তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আসবে।মাগুরায় পরপর দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা মাদকবিরোধী কার্যক্রমে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি করেছে। তবে শুধু মাদক উদ্ধার ও কয়েকজনকে আটক করেই অভিযান শেষ করা যথেষ্ট নয়।
মাদকেরউৎস, সরবরাহকারী, অর্থেরজোগানদাতা, পরিবহনকারী এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে এসআরবি, জেলা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের মধ্যে তথ্যের সমন্বয় করে আগের ও সর্বশেষ অভিযানের ঘটনাগুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। উদ্ধার হওয়া মাদক ও অর্থের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে কি না, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না এবং মাগুরায় মাদক সরবরাহের স্থায়ী কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না, তা অনুসন্ধান করে দেখা দরকার।পাশাপাশি সাংবাদিক মিরাজ আহমেদের করা জিডির বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাদক কারবারে যে-ই জড়িত থাকুক, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচয় কিংবা প্রভাব যেন তদন্তে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।মাদক তরুণ সমাজের ভবিষ্যৎ, পারিবারিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই মাগুরায় মাদকবিরোধী অভিযানকে কার্যকর পরিণতিতে নিতে হলে শুধু উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ নয়, এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।