হামিদুর রহমান, রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি:
রাজশাহীর তানোরে মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় এমন একজনকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে, যিনি ঘটনার সময় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। পুলিশের এজাহারে তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে ৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম হাফিজুর রহমান (৪০)। তিনি তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চন্দনকোঠা গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে। হাফিজুরের দাবি, মামলায় যে সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তখন তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরেই ছিলেন। পরে রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
তবে পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় অন্য আসামিদের সঙ্গে হাফিজুরও মিছিলে উপস্থিত ছিলেন এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় অংশ নেন।
এ ঘটনায় পুলিশের এজাহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বিষয়টিকে ভুল তথ্য অথবা ‘টাইপ মিসটেক’ হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মির্জা আব্দুল সালাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার সময় কারাগারে ছিলেন হাফিজুর
মামলার নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টা ১০ মিনিটে তানোরের পাগলা দেওয়ান সড়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি মিছিল বের হওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের দাবি, ওই মিছিল চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এর পরদিন ১৬ অক্টোবর শুক্রবার তানোর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ওই মামলার এজাহারে হাফিজুর রহমানকে ৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা মিছিল করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন এবং রাষ্ট্র ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেন। একই সঙ্গে অন্য আসামিদের সঙ্গে হাফিজুরও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
কিন্তু হাফিজুরের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।
কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও মিলেছে কারাগারে থাকার তথ্য
হাফিজুরের কারাগারে থাকার বিষয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ফৌজিয়া আক্তার ববি জানান, ১৫ অক্টোবর রাতে শতাধিক বন্দি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
তিনি বলেন, রাত ৯টার দিকে শেষ ব্যাচে হাফিজুরসহ রাজনৈতিক মামলার ছয়জন আসামি মুক্তির অপেক্ষায় একটি কক্ষে ছিলেন। ওই ছয়জনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। কারা কর্তৃপক্ষকে নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
ডেপুটি জেলার আরও জানান, হাফিজুর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন—এটি নিশ্চিত। তিনি রাত সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে মুক্তি পেয়ে থাকতে পারেন। কারাগারে তার মুক্তির সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। পাশাপাশি রেজিস্টার খাতায় তার স্বাক্ষর ও মুক্তির সময়ও উল্লেখ রয়েছে।
হাফিজুরের প্রশ্ন—‘তাহলে মিছিলে অংশ নিলাম কখন?’
শনিবার দুপুরে হাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার পুলিশ বাদী হয়ে আগের দিন রাত ৮টা ১০ মিনিটের ঘটনায় তাকে ৯ নম্বর আসামি করেছে।
তিনি বলেন, “পুলিশের মামলায় বলা হয়েছে, আমি ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম এবং মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণে অংশ নিয়েছি। অথচ ১৫ অক্টোবর রাত ৯টা ৪৭ মিনিটে আমি কারাগারের ফটক দিয়ে বের হয়ে আসি। ঘটনার সময় আমি কারাগারের ভেতরেই ছিলাম। তাহলে আমি মিছিলে অংশ নিলাম কখন, কীভাবে?”
হাফিজুর বলেন, “পুলিশ চাইলে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিসিটিভি ফুটেজ এবং রেজিস্টার খাতা পরীক্ষা করলেই প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে।”
চাঁদা দাবির বিরোধ থেকেই মামলা—পরিবারের অভিযোগ
হাফিজুরের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবা নুরুল ইসলাম প্রায় এক দশক আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বনিবনা না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। কয়েক মাস আগে নুরুল ইসলাম মারা যান।
হাফিজুর পেশায় চুল ব্যবসায়ী। চন্দনকোঠা বটতলা মোড়ে তার চুল কেনাবেচার দোকান রয়েছে।
পরিবারের দাবি, গত ৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় যুবদলকর্মী ইমরান আলী হাফিজুরের দোকানে গিয়ে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ইমরান তার দলবল নিয়ে দোকানে ভাঙচুর করেন এবং হাফিজুরকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
খবর পেয়ে তানোর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আহত হাফিজুরকে অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে পুলিশ চলে যায় বলে পরিবারের দাবি।
পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে হাফিজুর যুবদলকর্মী ইমরান আলীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে তানোর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তবে ওই অভিযোগের পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তার পরিবার।
২৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আটক
এর মধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তানোর থানা-পুলিশের একটি দল হাফিজুরের বাড়িতে গিয়ে দরজা ভেঙে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে তাকে গত ২৬ জুন দায়ের হওয়া একটি রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পরিবারের দাবি, ওই মামলার এজাহারে হাফিজুরের নাম না থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তীতে কয়েক দিন আগে আদালত থেকে জামিন পান তিনি।
জামিনে মুক্তির প্রক্রিয়া চলাকালীনই ১৫ অক্টোবর রাতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন হাফিজুর। আর সেই সময়েই তানোরে মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য—‘টাইপ মিসটেকও হতে পারে’
কারাগারে থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে একই সময়ে তানোরের ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মিছিলে অংশ নিলেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তানোর থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, পুলিশের কাছে ভুল তথ্য আসতে পারে। আবার টাইপ মিসটেকও হতে পারে।