দক্ষিণ সুরমা প্রতিনিধি
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ চীফ এসেসর (চলতি দায়িত্ব) আব্দুল বাছিত ও তার সিন্ডিকেট রাজস্ব ফাঁকির নতুন খেলায় মেতে উঠেছে। বিগত রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও বহাল তবিয়তে থেকে এবার তাদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়েছে সিসিকের বর্ধিত এলাকার নতুন ভবনসমূহ। করদাতাদের জিম্মি করে বিপুল অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিতে এই চক্রটি এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চতুর কৌশল অবলম্বন করছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।পুরনো সিন্ডিকেট ও সাবেক মেয়রের ‘অন্ধ সই’:অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের আমলে সাধারণ করদাতারা সরাসরি মেয়রের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ পেতেন না। এই সুযোগে চীফ এসেসর আব্দুল বাছিত, এসেসর আখতার সিদ্দিকী বাবলু এবং এসেসর কবির উদ্দিন চৌধুরী মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। করদাতাদের বাধ্য করা হতো এই সিন্ডিকেটের দ্বারস্থ হতে। তৎকালীন মেয়রের আস্থাভাজন শহীদ চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট অবৈধ অর্থের লেনদেন সম্পন্ন করত। সাধারণ মানুষের করের ফাইলগুলোতে শহীদ চৌধুরী নিজ হাতে কর কমানোর পরিমাণ লিখে দিতেন এবং তৎকালীন মেয়র আনোয়ারুজ্জামান অন্ধের মতো তাতে স্বাক্ষর করতেন। পরবর্তীতে শহীদ চৌধুরীর এই বিশাল দুর্নীতির বিষয়টি ফাঁস হলে মেয়র তাকে কার্যালয়ে আসতে নিষেধ করেন। এরপর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে মেয়র আনোয়ারুজ্জামান দেশ ছেড়ে পালালেও, পর্দার আড়ালের মূল কারিগর বাছিত সিন্ডিকেট ও শহীদ চৌধুরী কৌশলে পার পেয়ে যান।তদন্ত কমিটি ও ধামাচাপা দেওয়ার নেপথ্য কাহিনী:শহীদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হলেও রহস্যজনকভাবে ছাড় পেয়ে যান আব্দুল বাছিত, বাবলু ও কবির। এদের বিরুদ্ধে জাতীয় দৈনিক মানবজমিন, সমকাল, শ্যামল সিলেটসহ বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এমনকি সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সংক্ষুব্ধ নাগরিকরা মানববন্ধন করলে সিসিক কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। সিসিক সচিব আশিক নূরের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মতিউর রহমান খান এই সিন্ডিকেটকে বাঁচাতে মাঠে নামেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, সিআরও মতিউর রহমান তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে একটি দায়সারা তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেন। মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের দাবি, বিভিন্ন আবেদনে শহীদ চৌধুরীর নিজ হাতে লেখা কর কমানোর মূল কপিগুলো যদি তদন্ত দল যাচাই করত, তবে এই সিন্ডিকেটের সব গোমর তখনই ফাঁস হয়ে যেত। কিন্তু তদন্ত দল ইচ্ছাকৃতভাবেই সেদিকে পা বাড়ায়নি।কৌশল বদলে বর্ধিত এলাকায় নতুন থাবা:বিগত দিনে এই সিন্ডিকেট বর্ধিত এলাকায় এসেসমেন্ট কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হলেও বর্তমানে তারা নতুন উদ্যমে তৎপর হয়েছে। কর শাখার একজন মাঠকর্মী গোপন সূত্রে জানান, এবার তারা ‘ধীরে চলো’ নীতি বা চুপিসারে কার্যক্রম চালানোর কৌশল নিয়েছে। কারণ, একসাথে সব করদাতাকে নোটিশ দিলে এলাকায় তীব্র গণপ্রতিবাদ গড়ে উঠতে পারে। তাই ক্ষোভ এড়াতে বড় বড় হোল্ডিং ও ভবনগুলোকে বেছে বেছে পর্যায়ক্রমে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে, যাতে নীরবে-নিভৃতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য ও খাম লেনদেন সম্পন্ন করা যায়।শুধু তাই নয়, এই সিন্ডিকেট কর কমানোর পুরনো ফাঁদ আবারও চালু করেছে। সিসিকের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সরলতা ও রাজস্ব বৃদ্ধির আগ্রহকে পুঁজি করে তারা নিত্যনতুন ফাইল প্রশাসকের দপ্তরে পাঠাচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়বে—এমন সরল বিশ্বাসে প্রশাসক কর কমিয়ে দিচ্ছেন, আর মাঝপথ থেকে এই চক্রটি বিপুল অংকের অবৈধ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে সিসিক হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব।নাগরিক মহলের ক্ষোভ ও শুদ্ধি অভিযানের দাবি:সচেতন নাগরিক মহলের মতে—আব্দুল বাছিত, আখতার সিদ্দিকী বাবলু ও কবির উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সুরম্য অট্টালিকা ও বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ইতিমধ্যে সিসিকের নাগরিক সেবা বৃদ্ধি ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সিলেটে বেশ প্রশংসিত হয়েছেন। তবে সচেতন মহল মনে করছেন, বর্তমান প্রশাসকের সকল ভালো উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে যদি এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণ করা না হয়। সিসিকের এসেসমেন্ট শাখায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব সুরক্ষায় আব্দুল বাছিত, বাবলু ও কবির উদ্দিন চৌধুরীকে অবিলম্বে স্বপদ থেকে অপসারণ করে দুদকের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।