দুর্নীতি মামলায় আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি থেকে চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন (সিবিএ) কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন—এমন তথ্যের পক্ষে একাধিক নথি ও তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের সিবিএ কমিটিতে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত কর্মচারী কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, শ্রম অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আনার দাবি উঠেছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে মোঃ আসাদুজ্জামান (কর্মী নম্বর-০৯১১১), সিনিয়র ইলেকট্রিশিয়ান কে চাকরি থেকে বরখাস্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের ওই আদেশে বলা হয়, রমনা মডেল থানার মামলা নং-০২ (০১) ২০১৯ পরবর্তীতে মেট্রোপলিটন বিশেষ দায়রা মামলা নং-৩৪৩/২০২২ এবং বিশেষ মামলা নং-০৬/২০২৩ হিসেবে পরিচালিত হয়। ঢাকার বিশেষ আদালত নং-৬ এর ৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের রায়ে মোঃ আসাদুজ্জামানকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালতের রায়ে তাকে পৃথকভাবে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩(১)(ক) অনুযায়ী তাকে তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত (চাকরিচ্যুত ) করা হয় এবং অফিস আদেশে বলা হয়, ওই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে আরও জানা যায়, এই মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলই তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সিবিএ কমিটিতে সহ-সভাপতি হিসেবে স্থান পেয়েছেন। অর্থাৎ আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের আদেশে চাকরিচ্যুত একই ব্যক্তি কীভাবে আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সিবিএ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
এখানে বিষয়টি কেবল একই নামের ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং প্রাপ্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণে সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি এবং তিতাস গ্যাসের চাকরিচ্যুত কর্মচারী মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল একই ব্যক্তি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তার কর্মী নম্বর, পদবি, তিতাস গ্যাসের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য এবং সিবিএ কমিটিতে থাকা পরিচয়ের মধ্যে মিল রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি থেকে জানা গেছে। ফলে বিষয়টি এখন সিবিএ কমিটির বৈধতা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—সিবিএ কমিটি গঠনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি জানতে পারেনি যে, ওই ব্যক্তি তিতাস গ্যাসের একজন কর্মচারী হিসেবে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত? সিবিএ কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির সময় তার বিরুদ্ধে আদালতের রায় এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি কি যাচাই করা হয়েছিল? চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর একজন সাবেক কর্মচারী কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকতে পারেন? আর যদি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকে, তাহলে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিতাস গ্যাসের ২০ মে ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে চাকরিচ্যুতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও যদি একই ব্যক্তি সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে বহাল থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু তিতাস গ্যাসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং সিবিএ স্বীকৃতি, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
বিষয়টি নিয়ে তিতাস গ্যাস পিএলসির মহাব্যবস্থাপক মোঃ লুৎফর মাসুমকে অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সভাপতি খন্দকার জুলফিকার মতিনের কাছেও বিষয়টি অবগত করে বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুলের বক্তব্য জানার জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের মতো প্রতিষ্ঠানে একজন আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরিচ্যুত কর্মচারী যদি একই সঙ্গে সিবিএর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকেন, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গভীরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সিবিএ কমিটি অনুমোদনের সময় কী কী নথি যাচাই করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চাকরির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত ছিল কি না এবং চাকরিচ্যুতির পরও তার সিবিএ পদ বহাল থাকার আইনগত বা সাংগঠনিক ভিত্তি কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিতাস গ্যাস পিএলসি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি উঠেছে, তাদের নিজস্ব নথি যাচাই করে বিষয়টির সত্যতা স্পষ্ট করা হোক এবং চাকরিচ্যুত কর্মচারী কীভাবে সিবিএ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হোক।
পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি উঠেছে। দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির চাকরিচ্যুতি এবং পরবর্তীতে একই ব্যক্তির শ্রমিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার বিষয়টি কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত জটিলতার সঙ্গে যুক্ত কি না, তা প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে শ্রম অধিদপ্তরের কাছেও সিবিএ কমিটির স্বীকৃতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদে থাকার বৈধতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই বিষয়টি যাচাই করা জরুরি। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা নয়; বরং একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার স্বার্থে নথিভিত্তিক প্রশ্ন উত্থাপন করা।
এখন পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস পিএলসি, শ্রম অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি প্রশ্ন?
আদালতে দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এবং তিতাস গ্যাসের চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া মোঃ আসাদুজ্জামান বাবুল যখন একই ব্যক্তি হিসেবে তিতাস গ্যাস জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন সিবিএ কমিটির সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন, তখন কোন প্রক্রিয়ায় তিনি ওই পদে এলেন এবং চাকরিচ্যুতির পরও কীভাবে পদটি বহাল থাকল?
নথি-প্রমাণের আলোকে উত্থাপিত এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় তদন্ত এখন সময়ের দাবি জানিয়েছেন তিতাস গ্যাস শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের একাংশ।