হামিদুর রহমান, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি:
রাজশাহীর তানোর উপজেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিব নদ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এক সময়ের প্রমত্তা এ নদটি বর্তমানে দখল, দূষণ এবং পলি জমে ভরাট হয়ে কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসের শুরুতেই নদে পানি না থাকায় বোরো ধানসহ রবিশস্য আবাদে মারাত্মক পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে নদ তীরবর্তী কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আশির দশকেও যে নদ দিয়ে নিয়মিত লঞ্চ চলাচল করত এবং যা ছিল তানোরের প্রধান নৌপথ, আজ সেই নদ কোথাও হাঁটু সমান পানিতে সীমাবদ্ধ, আবার কোথাও বিশাল বালুচরে পরিণত হয়েছে। এক সময় এই নদকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের কৃষি ও জনজীবনের সমৃদ্ধ ইতিহাস।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিব নদ নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর এলাকায় আত্রাই নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাজশাহীর পবা উপজেলার বাগধানী এলাকায় জামদহ নদে মিলিত হয়ে বারনই নদ নাম ধারণ করে। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নওহাটা থেকে এই নৌপথে নিয়মিত পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করত।
তবে ষাটের দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে মান্দার বৈদ্যপুর এলাকায় বাঁধ নির্মাণের ফলে নদটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সেই থেকেই শুরু হয় এর ধীরে ধীরে মৃত্যুর যাত্রা। বর্তমানে নদটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা ও কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় নদনির্ভর হাজার হাজার একর জমির বোরো আবাদ হুমকির মুখে পড়েছে।
তানোরের মুন্ডুমালা এলাকার কৃষকরা জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট তীব্র হওয়ায় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) থেকেও অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে কৃষি টিকিয়ে রাখতে শিব নদ পুনঃখননের কোনো বিকল্প নেই।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড নদটির সাথে সংযুক্ত কিছু খাড়ি খননের উদ্যোগ নিলেও মূল নদটি এখনো অবহেলিত রয়েছে। নদে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় খাড়ি খননের সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না।
একাধিক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মূল নদে পানি না থাকলে খাড়ি খনন করে কোনো লাভ নেই। দ্রুত শিব নদ খনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত না করলে আমাদের ফসল ফলানোই বন্ধ হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নদটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা না গেলে আগামীতে এ অঞ্চলের বিশাল কৃষিজমি পতিত হয়ে পড়তে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে অবিলম্বে শিব নদ খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
এক সময়ের প্রাণবন্ত শিব নদ আজ মৃতপ্রায়। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে শুধু একটি নদ নয়, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটি অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকা ব্যবস্থা। এখনই প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন।