মোঃ শাহজাহান বাশার: পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) ও ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস ও আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ধর্মপ্রাণ সুফিবাদী জনতার উপস্থিতিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সাদা পোশাক ও টুপি পরা মানুষের উপস্থিতি, কালেমাখচিত পতাকা, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, রঙিন ফেস্টুন ও জাতীয় পতাকায় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজপথ।
ভোরের আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চল থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জড়ো হতে শুরু করেন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্যানজুড়ে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণ ও প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল ১১টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ গেট থেকে আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার সভাপতি, আওলাদে রাসুল (দ.) শাহ সুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী (মা.জি.আ.)-এর নেতৃত্বে জশনে জুলুস শুরু হয়। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাটি দোয়েল চত্বর, শিক্ষা ভবন ও সচিবালয় সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসে শেষ হয়।
জশনে জুলুস চলাকালে ‘ইয়া নবী সালামু আলাইকা’ ও ‘ইয়া রাসূল সালামু আলাইকা’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল কালেমাখচিত পতাকা, মহানবী (দ.)-এর আদর্শ, শান্তি ও মানবতার বিভিন্ন বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড এবং রঙিন ফেস্টুন। অনেকের হাতে ছিল বিশাল জাতীয় পতাকাও। ধর্মীয় আবেগ ও মহানবী (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে শোভাযাত্রায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জশনে জুলুস শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশ। এতে সভাপতিত্ব করেন আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার সভাপতি শাহ সুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাঁর শিক্ষা, জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (দ.) মানুষকে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে মহানবী (দ.)-এর আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহানবী (দ.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হলে মানুষের মধ্যে বিভেদ, হিংসা ও বৈষম্য কমে আসবে এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ মেহেবুবে মইনুদ্দীন এবং মইনীয়া যুব ফোরামের সভাপতি ও ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব সুফি স্কলারসের আহ্বায়ক শাহজাদা সৈয়দ মাশুক মইনুদ্দীন। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তুরস্কের শেখ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ এলহুসেইনী; মরক্কোর শেখ প্রফেসর ড. লাখদার দেরফুফি ও শায়খ সিদিআলী মা আলায়নিন; কানাডার শেখ ফয়সল হামিদ আব্দুর রাজ্জাক; শ্রীলঙ্কার শেখ মোহাম্মদ রেজা বিন আব্দুল লতিফ আল মাগদুমী; জর্ডানের শেখ সাফওয়ান (মোহাম্মদ রিদা) আলী ওদেইবাত; সৌদি আরবের শেখ আল রাশেদ আব্দুল্লাহ হাম্মাদা; সোমালিয়ার শেখ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ওমর সৈয়দ; অস্ট্রেলিয়ার শেখ ডক্টর আব্দুল নাসের শামসিন; মিশরের শেখ প্রফেসর ড. ইউসরি রোশদি এল সাইয়্যিদ জাবর আল হাসানী; লেবাননের শেখ রিয়াদ হাসান বাজু; ব্রাজিলের শায়খ মোহাম্মদ আল মাগারবি; পাকিস্তানের শায়খ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাফর ইকবাল জালালী এবং ভারতের শায়খ নাবিল আখতার নওয়াজী।
এ সময় দেশীয় অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এমিরেটস ড. আনিসুজ্জামান, আঞ্জুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়ার সাধারণ সম্পাদক খলিফা আলমগীর খান, মাওলানা মুফতি বাকি বিল্লাহ আজহারী, মাওলানা রুহুল আমিন ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম, গবেষক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।
মহাসমাবেশে বক্তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবন ও আদর্শ বিশ্বমানবতার জন্য শান্তি, সম্প্রীতি, ন্যায় ও কল্যাণের পথনির্দেশনা। তাঁর শিক্ষা অনুসরণের মাধ্যমে সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অমানবিকতা দূর করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি মানবিকতা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তারা বলেন, ব্যক্তি ও সমাজজীবনে মহানবী (দ.)-এর আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই শান্তি ও সৌহার্দ্যের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মহানবী (দ.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবতার শিক্ষা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শক্তিশালী করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়াতে পারলেই একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
মহাসমাবেশে নারী অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ধর্মীয় আবেগ, মহানবী (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং শান্তির বার্তায় মুখর এ আয়োজন শেষে দেশ, জাতি, বিশ্বশান্তি ও মানবতার কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের বর্তমান ইমাম শাহ সুফি ড. শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী। মোনাজাতে বাংলাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকটের অবসান এবং বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়।
বর্ণাঢ্য জশনে জুলুস ও আন্তর্জাতিক শান্তি মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জীবন ও আদর্শ ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, সহমর্মিতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।