মোঃ শাহজাহান বাশার
শবে কদর বা লাইলাতুল কদর ইসলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। এটি রহমত, মাগফিরাত (ক্ষমা) ও নাজাতের (মুক্তি) রাত। আল্লাহ তাআলা এই রাতকে এত বেশি সম্মানিত করেছেন যে, তিনি এ রাত সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন—সূরা আল-কদর।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটি (পবিত্র কোরআন) নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ (হযরত জিবরাইল আ.) তাদের প্রতিপালকের আদেশে অবতরণ করেন প্রত্যেক কাজের জন্য। এটি শান্তিময়, ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।” (সূরা আল-কদর: ১–৫)
এই আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট হয় যে, এই রাতেই কোরআন নাযিল শুরু হয় এবং এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম, অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের চেয়েও বেশি সওয়াবের অধিকারী। এ রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং সারা রাত শান্তি ও বরকতে পরিপূর্ণ থাকে।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটি নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে… এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করা হয়।” (সূরা আদ-দুখান: ৩–৪)। তাফসিরকারগণ বলেন, এখানে বরকতময় রাত বলতে লাইলাতুল কদরকেই বোঝানো হয়েছে। এ রাতে মানুষের বাৎসরিক তাকদীর—রিজিক, মৃত্যু, জীবনঘটনা ইত্যাদির নির্দেশ প্রদান করা হয়।
হাদিস শরিফে লাইলাতুল কদরের ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” (সহিহ বুখারি)। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতগুলোতে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোযোগী হতে হবে।
হযরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই, তাহলে কী দোয়া পড়বো?” তিনি ﷺ উত্তরে বলেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি”—অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি পরম ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (সুনান তিরমিজি)
রাসূলুল্লাহ ﷺ রমজানের শেষ দশকে এত বেশি ইবাদত করতেন যে, অন্য সময়ে এতটা করতেন না। তিনি পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে তুলতেন এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। এ থেকে বোঝা যায়, শবে কদর পাওয়ার জন্য বিশেষ চেষ্টা ও একাগ্রতা প্রয়োজন।
অতএব শবে কদর হলো রহমতের দরজা উন্মুক্ত হওয়ার রাত, গুনাহ মাফের রাত, জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাত, ফেরেশতাদের অবতরণের রাত এবং তাকদীর নির্ধারণের রাত। এই রাত একজন মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই আমাদের উচিত রমজানের শেষ দশকে আন্তরিক তওবা, ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির-আজকার ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন। 🤲🌙