হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় বৃহস্পতিবার (৭ মে) ভোর আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে আকস্মিক ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, গাছপালা ও আবাদি জমির ওপর নেমে আসে দুর্যোগের তাণ্ডব। বিশেষ করে ধানখেত ও আমবাগানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
ভোরের ঝড়ে অনেক এলাকার গাছ উপড়ে পড়ে, কোথাও ভেঙে যায় গাছের ডালপালা। মাঠের পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং আমবাগানের গাছে থাকা কাঁচা ও আধাপাকা আম ঝরে পড়ে পুরো বাগানজুড়ে ছড়িয়ে যায়। এতে কৃষক ও আমচাষিদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।
সকালে ঝড় থামার পর দেখা যায়, গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট শিশু ও কিশোররা আনন্দের সঙ্গে ঝরে পড়া আম কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যেই ছিল ছোট শিশু ফাহিম। হাতে ঝুড়ি নিয়ে আম কুড়াতে কুড়াতে সে আনন্দ প্রকাশ করে বলে, “অনেক আম পড়েছে, আমি কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে যাবো।”
অন্যদিকে কৃষকদের মুখে ছিল হতাশা আর দুশ্চিন্তার ছাপ। উপজেলার এক কৃষক জলিল জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। কিন্তু ভোরের ঝড় ও বৃষ্টিতে তার পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমি পাঁচ বিঘা ধান লাগিয়েছিলাম। সমস্ত ধান শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি কিভাবে সংসার চালাবো বুঝতে পারছি না। বছরের সব আশা ভরসা এই ফসলের ওপর ছিল।”
একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন আম ব্যবসায়ীরাও। আম ব্যবসায়ী মিলন জানান, তিনি দুই বিঘা আমের বাগান লিজ নিয়েছিলেন। ঝড়ের পর সকালে বাগানে এসে দেখেন অধিকাংশ আম মাটিতে পড়ে গেছে। তিনি বলেন,
“অনেক টাকা খরচ করে বাগান লিজ নিয়েছি। এখন দেখি গাছে আম নেই বললেই চলে। যে পরিমাণ আম পড়ে গেছে তাতে খরচের টাকাও উঠবে কিনা জানি না। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।”
স্থানীয়রা জানান, কয়েক মিনিটের এই ঝড়েই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষকদের। অনেক জমিতে পানি জমে গেছে এবং পাকা ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খান বলেন,
“ভোরের আকস্মিক ঝড়ে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।”
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন,
“প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। সরকারি ভাবে যতটুকু সম্ভব কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আমরা সব সময় কৃষকদের পাশে আছি এবং মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে।”
এদিকে দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারের জরুরি সহায়তা ও প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত সহযোগিতা না পেলে অনেক পরিবার মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের আকস্মিক ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। ফলে কৃষকদের সুরক্ষায় আগাম সতর্কতা, কৃষি বীমা এবং জরুরি পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।