হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় আলু উত্তোলন মৌসুম শুরু হতেই বস্তার বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তার দাম প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে একটি বস্তা ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় পাওয়া যেত, সেখানে বর্তমানে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এতে করে চরম বিপাকে পড়েছেন আলু চাষীরা।
কৃষকদের দাবি, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বস্তার দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাজার তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তানোর উপজেলায় বর্তমানে পুরোদমে আলু উত্তোলন চলছে। আলু হিমাগার বা মোকামে পাঠানোর জন্য প্রচুর বস্তার প্রয়োজন হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বস্তা ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বস্তা কিনে বাড়ি ফিরছিলেন তানোর উপজেলার কৃষক রাহিমুল ইসলাম। তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগেও বস্তার দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। হঠাৎ করে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। দেশে তো বস্তার কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে এত দাম কেন? মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছা করেই কৃষকদের বিপদে ফেলছে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু বাজারে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিং থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না।”
আরেক আলু চাষী মিলন হোসেন জানান, বছরের শুরুতে একটি বস্তার দাম ছিল ৭৮ থেকে ৮২ টাকার মধ্যে। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ টাকা করে বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
আলু চাষীদের অভিযোগ, বস্তা ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ী ও কিছু হিমাগার সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। অতীতে এমন পরিস্থিতি দেখা না গেলেও এবারের মৌসুমে নতুন করে বস্তা সিন্ডিকেট শুরু হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
এদিকে আলুর বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আলু উত্তোলনের পর প্রথমদিকে প্রতি কেজি আলুর দাম ছিল প্রায় সাড়ে ৯ টাকা। পরে তা বেড়ে ১৩ থেকে ১৪ টাকায় উঠলেও বর্তমানে আবার কমে ১১ থেকে ১২ টাকায় নেমে এসেছে।
চাষীদের অভিযোগ, আলুর দাম নির্ধারণ করছে ফড়িয়া, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের একটি প্রভাবশালী চক্র। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কৃষিপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নির্ধারণের দায়িত্ব কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। কিন্তু বাস্তবে তাদের কোনো কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
কৃষকেরা আরও জানান, আলু উত্তোলনের সময় ট্রাক্টরের মাধ্যমে জমি থেকে আলু তোলা হয়। কিন্তু সম্প্রতি জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু খুচরা ব্যবসায়ী তেল মজুত করে দোকান বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে কৃষকদের অতিরিক্ত দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে সিন্ডিকেটের কারণেই তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি বাড়ছে। এতে আলু উৎপাদনের খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
চাষীরা বলেন, “একদিকে বস্তার দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আলুর দাম কমছে। উৎপাদন খরচই তুলতে পারছি না। আলু চাষ যেন এখন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তারা আরও বলেন, “কৃষকরা উৎপাদন করছে বলেই ভোক্তারা কম দামে আলু খেতে পারছেন। যদি কৃষক উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তাহলে ভোক্তাদের অনেক বেশি দামে আলু কিনতে হবে।”
এছাড়া আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তায় আলু সংরক্ষণের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ৭০ থেকে ৭৫ কেজি পর্যন্ত আলু ভরে বস্তা বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসব বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের কোনো কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
তাদের দাবি, প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করা হলে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র এতটা বেপরোয়া হতে পারত না। তাই দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার করে বস্তা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খাঁনের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।