মোঃ শাহজাহান বাশার
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
কুমিল্লা, ৪ আগস্ট ২০২৫ —
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট কুমিল্লার আলেখারচর এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি আবাসিক হোটেল এখন দেহ ব্যবসা ও মাদকসেবনের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর ধরে এই বেআইনি কর্মকাণ্ড চলছে নির্ভয়ে ও প্রকাশ্যে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক চিত্র—‘বৈশাখী’, ‘সাততলা’ ও ‘কুমিল্লা হাইওয়ে হোটেল’-এর দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিন চলছে অনৈতিক কার্যকলাপ। এসব হোটেলে স্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে যৌনকর্মী নারী, যাদের মাধ্যমে চলছে দেহ ব্যবসা। পাশাপাশি মাদকসেবীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে নির্দিষ্ট কক্ষ, যেখানে নিয়মিতই চলছে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও বিদেশি মদের সেবন।
জানা গেছে, হোটেলগুলোতে নারী সরবরাহ ও দেহ ব্যবসা পরিচালনার মূল হোতা ‘শান্ত’ নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী দাবি করলেও বাস্তবে তিনি একটি সক্রিয় দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রক।
শান্ত ও তার সহযোগীরা হোটেলগুলোর নির্দিষ্ট কক্ষ বরাদ্দ দেয় ‘বিশেষ গ্রাহকদের’ জন্য, যেখানে যৌনকর্মীদের রাখা হয় দিনের পর দিন। এসব কক্ষই ব্যবহৃত হয় দেহ ব্যবসার মূল স্থল হিসেবে।
স্থানীয়রা জানায়, যৌনকর্মী ও মাদকসেবীদের নিরাপদ রাখার জন্য নিয়মিতভাবে থানার কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যের সঙ্গে অর্থ লেনদেন করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন,
“প্রতি মাসে মাসোহারা দিয়ে হোটেল মালিকরা পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে। র্যাব বা পুলিশের অভিযানের পরও কয়েকদিনের মধ্যে আবার সব চালু হয়ে যায়।”
সূত্রে জানা গেছে, এসব হোটেলে বিগত কয়েক বছরে একাধিকবার র্যাব ও কোতোয়ালি মডেল থানা অভিযান চালিয়েছে। যৌনকর্মী ও তাদের খদ্দারসহ বহুজনকে গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে জেলেও পাঠানো হয়েছে।
তবে প্রতিবারই দেখা গেছে, কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এই দেহব্যবসা ও মাদকের আসর।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মহিনুল ইসলাম বলেন,
“আমি একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি এবং মামলা দিয়েছি। স্থানীয়দের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে প্রয়োজনে হোটেলগুলো সিলগালা করা হবে।”
আলেখারচর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব হোটেলের প্রভাবে এলাকার যুব সমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। উঠতি বয়সী অনেক ছেলেই আজ নিয়মিত মাদকসেবী ও যৌন আসক্তিতে আক্রান্ত। স্থানীয় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররাও অনৈতিক এই পরিবেশে সহজেই জড়িয়ে পড়ছে অবক্ষয়ের চক্রে।
এলাকাবাসীর ভাষায়,“প্রথমে কৌতূহল, পরে নেশা, তারপর জীবন ধ্বংস—এই তিন ধাপেই আমাদের ছেলেমেয়েরা চলে যাচ্ছে। আমরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো হুমকি পাই। পুলিশকেও জানানো হয়েছে বহুবার, লাভ হয়নি।”
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, হোটেল মালিকদের বাড়ি কুমিল্লার বাইরের উপজেলায় হলেও তারা স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের আশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
নাজিরাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে হোটেল মালিকদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের ছত্রছায়ায় প্রশাসনিক অভিযানও নাকি অনেক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, অভিভাবক, সমাজকর্মী এবং সাধারণ মানুষ একত্রে দাবি তুলেছেন—এইসব হোটেলকে অবিলম্বে সিলগালা করতে হবে এবং শান্তসহ সংশ্লিষ্ট দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এলাকাবাসী আরও বলেন,“এখনই ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা ভবিষ্যতে অপরাধীদের ঘাঁটি হয়ে যাবে। আমাদের ছেলে-মেয়েদের জীবন বাঁচাতে হোটেলগুলো বন্ধ করতে হবে।”
একটি উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন সমাজে নৈতিকতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত থাকে। কুমিল্লার আলেখারচরের এসব হোটেল যেন হয়ে উঠেছে সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিবেকবানদের উচিত—এইসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
এই প্রতিবেদনের পরবর্তী অংশে তুলে ধরা হবে—শান্ত ও তার সহযোগীদের বিস্তারিত পরিচয়, মাসিক চাঁদার অঙ্ক, পুলিশ-হোটেল লেনদেনের ধরন এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অন্তরালের রহস্য।