হামিদুর রহমান, তানোর, রাজশাহীপ্রতিনিধি :
তানোর উপজেলার একটি গ্রামে গভীর রাতে বাড়ির মূল ফটকে শিকল তুলে বাইরে থেকে আটকে রেখে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে পাঁচটি পরিবারের বসতবাড়ি ও সব আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে নগদ ১৫ লাখ টাকাসহ প্রাথমিকভাবে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে, পাঁচন্দর ইউনিয়ন–এর ইলামদহী গ্রামে।
শিকল তুলে বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে আগুন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা বাড়ির বাইরের গেটে শিকল তুলে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়—স্পষ্টতই বাড়ির লোকজনকে পুড়িয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে এই অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইলামদহী গ্রামের বাসিন্দা রাসেল জানান,
“প্রথমে দরজায় শিকল দেওয়া হয়। তারপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়। আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।”
আগুন, আগুন’ চিৎকারে ছুটে আসে মানুষ।আগুন দেখতে পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গৃহবধূ ফেরদৌসী চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মুহূর্তের মধ্যেই পাশের বাড়িগুলোতেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পুড়ে গেছে পাঁচ পরিবারের সবকিছু। এই ঘটনায় যাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ পুড়ে গেছে—
ফেরদৌসী তার বোন বিলকিস
মোজাম্মেল তার ভাই নুর ইসলাম
ফেরদৌসীর মেয়ের পরিবার
ফেরদৌসীর ঘরে থাকা নগদ ১৫ লাখ টাকা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্বজনরা।
নারীসহ আহত দুইজন, জানালা ভেঙে বের করা হয়।কলেজ ছাত্রীকে এই অগ্নিকাণ্ডে দুই নারী আহত হয়েছেন।
ফেরদৌসীর মেয়ে নাসিমার কপালে আগুনে দগ্ধের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া ফেরদৌসীর কলেজপড়ুয়া আরেক মেয়েকে জানালা ভেঙে ঘর থেকে বের করে আনা হয়। তার শরীরের বিভিন্ন অংশে আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। নাসিমার স্বামী সিরাজুল ইসলাম বলেন,আগুন আমাদের জীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমার স্ত্রী ও শালিকার শরীরের কিছু অংশ পুড়েছে। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে আনা হয়েছে। ঘরের ধান-চাল থেকে শুরু করে কিছুই অবশিষ্ট নেই। ফায়ার সার্ভিসের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে।সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। তবে ততক্ষণে পাঁচ পরিবারের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়,
“কে বা কারা আগুন দিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফজরের সময় দেখা যায় ছাইস্তূপ।
স্থানীয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর ইউনিয়ন আমির জুয়েল বলেন, ফজরের নামাজের সময় চিৎকার শুনে ছুটে গিয়ে দেখি পাঁচ পরিবারের বসতবাড়ি একেবারে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”
এটি পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা’ — ওয়ার্ড সদস্য পাঁচন্দর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য সাদিকুল ইসলাম বলেন, গভীর রাতে এভাবে আগুন দেওয়া মানে মানুষ পুড়িয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা। আল্লাহর রহমতে সবাই বেঁচে গেছে। কিন্তু তাদের ঘরে এখন কিছুই নেই। দ্রুত সরকারি সহায়তা খুব জরুরি।”
বিএনপি নেতার পরিদর্শন ও সহানুভূতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–এর নেতা মমিনুল হক মমিন।
তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা। তবে কেউ প্রাণ হারায়নি—এটাই আল্লাহর বড় রহমত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে। ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য
পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন,
“ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে তা বিতরণ করা হবে।”
প্রতি পরিবার পাবে টিন ও নগদ সহায়তা।উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আল মামুন জানান,
“সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি পরিবারকে দুই বান্ডিল করে টিন এবং ছয় হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। ইউএনওর বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও নাঈমা খান—তানোর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)—এর সরকারি মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কান্নায় ভেঙে পড়েছে পুরো গ্রাম
ঘটনার পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা বাকরুদ্ধ।
কারও মুখে কথা নেই—শুধু হাউমাউ করে কান্না।
তাদের কণ্ঠে একই প্রশ্ন—
“এখন আমরা কী খাব? কোথায় থাকব?” ইলামদহী গ্রামে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্রুত ঘটনার তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।