• সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ০৫:০২ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে গ্রামের শিক্ষাবিপ্লব তানোরে তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজে নিয়োগ তদন্তে বাধা, বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাকে হুমকি — স্থগিত তদন্ত, রোববার ফের শুনানির দিন দেবিদ্বারে চাঁদাবাজি-মাদকের বিরুদ্ধে এমপি হাসনাতের কঠোর বার্তা ধর্মপাশায় নেশার টাকার জন্য মাকে মারধর, তরুণের ৬ মাসের কারাদণ্ড আনোয়ারায় শাওলিন কুংফু এন্ড উশু একাডেমির ইফতার মাহফিল সম্পন্ন মধ্যনগরে পূর্ব বিরোধে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে টেটাবিদ্ধ ২, আহত আরও কয়েকজন ফকিরহাটে মাদ্রাসা পর্যায়ে একমাত্র ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেল মেহেনাজ আক্তার সোহাগী ফকিরহাটে এমপির সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের মতবিনিময় ভান্ডারিয়ায় সরিষা ও গমের বাম্পার ফলনে কৃষক ও ফুল প্রেমিদের উচ্ছ্বাস ভান্ডারিয়ায় বিদেশী পিস্তল সহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ

নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে গ্রামের শিক্ষাবিপ্লব

Reporter Name / ৪৪ Time View
Update : রবিবার, ১ মার্চ, ২০২৬

মোঃ শাহজাহান বাশার

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রাম। এক সময়ের অবহেলিত, শিক্ষাবঞ্চিত, সুযোগ-সুবিধাহীন একটি জনপদ। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না, কলেজ তো কল্পনাতেও আসত না। দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতেই হোঁচট খেত বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে। অনেকের শিক্ষাজীবন থেমে যেত অর্থের অভাবে, কারও স্বপ্ন ঝরে পড়ত অকালেই। সেই গ্রামেই আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একাধিক কলেজ, উচ্চ বিদ্যালয়, মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন ও পাঠাগার। হাজারো শিক্ষার্থীর কোলাহলে মুখরিত জনপদটি এখন শিক্ষার আলোকবর্তিকা।

এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন এক প্রবাসী—মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। পেশায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ট্যাক্সিচালক। কিন্তু পরিচয়ের সীমা সেখানে শেষ নয়। তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক এবং ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শৈশবেই সংগ্রামের সূচনা

মোশাররফের জন্ম শিক্ষক পরিবারে। পিতা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ তিনি পেয়েছিলেন পরিবার থেকেই। তাঁর প্রপিতামহ ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিক্ষার আলো ছড়ানো যেন ছিল তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য।

কিন্তু ভাগ্য বড় নির্মম। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি হারান বাবাকে। সংসারের হাল ধরতে হয় অল্প বয়সেই। মা ও পাঁচ ভাইবোনের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝেছিলেন—কষ্ট ছাড়া সামনে এগোনোর পথ নেই। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লেও পরিবারের দায়িত্বই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

কাতারে পাথর ভাঙা শ্রমিক

১৯৮২ সালে তিনি পাড়ি জমান কাতারে। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে শুরু হয় তাঁর প্রবাসজীবন। কাজ ছিল পাইলিংয়ের জন্য শক্ত পাথর ভাঙা। বিশাল পাথরের ওপর হাতুড়ির আঘাত, হাতে ফোসকা, পায়ে আঘাত, অসহনীয় ক্লান্তি—সবই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। অনেক সহকর্মী সে কঠিন কাজে টিকতে পারেননি। কিন্তু মোশাররফের পিছু হটার সুযোগ ছিল না। কারণ তাঁর সংগ্রাম শুধু নিজের জন্য নয়—পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য।

দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে কিছু সঞ্চয় করতে সক্ষম হন তিনি। ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ জোগান, সংসারের হাল ধরেন। নিজের শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও পরিবারের অন্যদের শিক্ষিত করতে কোনো কার্পণ্য করেননি।

গ্রামের জন্য প্রথম বড় সিদ্ধান্ত

চার বছর পর দেশে ফিরে দেখলেন, তাঁর গ্রামে এখনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। আশপাশের গ্রাম থেকেও শিক্ষার্থীদের অনেক দূরে যেতে হয় পড়াশোনার জন্য। এতে ঝরে পড়ার হার ছিল উদ্বেগজনক। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বহুবার আলোচনা করলেও জমি ও অর্থের অভাবে স্কুল প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছিল না।

সেই সময় তরুণ মোশাররফ এক সভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন—বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে যে অর্থ উপার্জন করেছি, তা দিয়ে স্কুলের জমি কিনব। তাঁর এই ঘোষণা ছিল সাহসী এবং অনুপ্রেরণামূলক। শুধু কথায় নয়, বাস্তবেও তিনি জমি কেনেন, ভবন নির্মাণ করেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলেন।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী

১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করে আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। শুরুতে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় একশ। আজ সেখানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এটি।

নিউইয়র্কে নতুন অধ্যায়

একই বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নিউইয়র্কে শুরুতে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরে রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকানে চাকরি নেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর অনুমতি পান। সেখান থেকেই শুরু দীর্ঘ তিন দশকের পথচলা।

নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে দিনের পর দিন স্টিয়ারিং হাতে কাটালেও তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ধান্যদৌল গ্রাম। অন্য অনেক প্রবাসীর মতো বিলাসবহুল জীবনযাপন বা সম্পদ সঞ্চয়ের পথে না হেঁটে তিনি বেছে নেন এক ভিন্ন দর্শন—ত্যাগ ও সমাজসেবা।

একে একে গড়ে ওঠে ছয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় আশেদা-জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা, মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা এবং মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন।

বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলেজে স্নাতক পর্যায়ে দশটি বিষয় এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি বিষয় চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ফলাফলের দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে শীর্ষ দশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে বিস্তৃত খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও সহপাঠ কার্যক্রমের সুযোগ। গ্রামের শিক্ষার্থীরা এখন নিজ এলাকায় থেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।

পাঠাগার, হাসপাতাল ও মানবিক উদ্যোগ

শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও মানবিক উন্নয়নেও নজর দিয়েছেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেছেন দুটি পাঠাগার—আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি এবং ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা সমমূল্যের জমি দিয়েছেন। গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য গড়েছেন বৃত্তি তহবিল; ইতোমধ্যে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। দশটি গৃহহীন পরিবারকে নির্মাণ করে দিয়েছেন ঘর। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও রয়েছে তাঁর অবদান।

শতবর্ষী বটগাছ রক্ষার ঘটনা

ধান্যদৌল গ্রামের শ্রীশ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণের একটি শতবর্ষী বটগাছ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনি বিদেশে বসেই খবর পান। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে গাছটি কিনে নেন এবং পরে মন্দির কর্তৃপক্ষকেই দান করেন। ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

প্রবাসে সাদামাটা জীবন

দুই সন্তানের জনক হলেও তিনি এখনো প্রবাসে মেসে সাধারণভাবে বসবাস করেন। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়ে চলে যায় তিনবেলা। পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে না নেওয়ার কারণ—অতিরিক্ত খরচ বাঁচিয়ে সেই অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। তাঁর এই সিদ্ধান্তে স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর সমর্থন ও ত্যাগের কথা তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

৬২ বছরেও শিক্ষার্থী

বর্তমানে তাঁর বয়স ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও তিনি আবারও শিক্ষাজীবনে ফিরেছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। তাঁর বিশ্বাস—শিক্ষার কোনো বয়স নেই, শেখার কোনো শেষ নেই।

ত্যাগের দর্শনে আনন্দ

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়—সত্যিকারের সাফল্য শুধু অর্থ বা বিলাসে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার মধ্যেই নিহিত। নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে ট্যাক্সি চালাতে চালাতে তিনি আসলে গড়ে তুলেছেন একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ। তাঁর ত্যাগ, দূরদৃষ্টি ও মানবিকতার আলোয় ধান্যদৌল আজ শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

স্টিয়ারিং হাতে প্রবাসে থাকলেও তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা এখনো নিজের গ্রাম। যত দিন বাঁচবেন, মানুষের কল্যাণেই বাঁচতে চান—এই অঙ্গীকারেই এগিয়ে চলেছেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd