মোঃ শাহজাহান বাশার | বিশেষ প্রতিবেদন
কুমিল্লা-৫ তথা বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা-ইতিহাসে কিছু মানুষ তাঁদের পদ-পদবির চেয়েও বড় হয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। সময়ের পরিবর্তনে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় হয়তো ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, শিক্ষা উদ্যোক্তা এবং চারবারের জাতীয় সংসদ সদস্য। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন মাটি ও মানুষের মানুষ। দল-মত-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে থাকার কারণে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার বহু মানুষের কাছে তিনি পরিণত হয়েছিলেন একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ১৯৪৪ সালের ৪ জুলাই কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলভী মো. চান্দ মিয়া মুন্সী এবং মাতা হাজেরা খাতুন। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। জীবনের শুরুতেই এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলেও মা ও চাচার স্নেহ-শাসন, নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাজীবনে এগিয়ে যান এবং পরবর্তী সময়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন মেধাবী শিক্ষাবিদ ও জননেতা হিসেবে।
শৈশব থেকেই অধ্যাপক ইউনুস ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তিনি গোপীনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীপুর ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ও বুড়িচং জুনিয়র মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬০ সালে কুমিল্লা হোচ্ছামিয়া বাই মাদ্রাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ঢাকা বোর্ডের মেধাতালিকায় ১২তম স্থান অর্জন করেন। এরপর ১৯৬২ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে গণিতে বিএসসি সম্মান সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন। অসাধারণ এই শিক্ষাগত সাফল্য পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষকতা ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার ভিত আরও শক্ত করে।
অধ্যাপক ইউনুসের কর্মজীবনের একটি বড় অধ্যায় ছিল শিক্ষকতা। বুড়িচং আনন্দ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর পেশাজীবনের সূচনা। এরপর দেবিদ্বার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ, চৌদ্দগ্রাম চিওড়া কলেজ ও নিমসার জুনাব আলী কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অন্যতম বড় অবদান ছিল বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি বুড়িচং অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর কাছে শিক্ষা শুধু একটি সনদ অর্জনের বিষয় ছিল না; শিক্ষা দিয়ে মানুষকে আলোকিত করা, যুক্তিবাদী করে গড়ে তোলা এবং সমাজকে এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর চিন্তার অন্যতম কেন্দ্র।
শিক্ষকতার পাশাপাশি ছাত্রজীবনেই অধ্যাপক ইউনুসের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৬২ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা আরও বিস্তৃত হয়। তৎকালীন ঢাকা হল, বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ও ডাকসুর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য তাঁর জীবনীভিত্তিক বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। ষাটের দশকের শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা এবং ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের রাজনৈতিক পরিবেশেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। ছাত্ররাজনীতির সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর জাতীয় রাজনীতির পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ত্রিপুরার আগরতলা অঞ্চলে স্থাপিত বক্সনগর ও পদ্মনগর যুব প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের সঙ্গে তিনি দায়িত্বশীলভাবে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছাত্র ও যুবকদের সংগঠিত করা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায় তাঁর ভূমিকার কথাও বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। একই সময়ে পদ্মনগর শরণার্থী রিসেপশন ক্যাম্পের দায়িত্বের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসা শরণার্থীদের গ্রহণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে তিনি কাজ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানি বাহিনী আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় বলেও তাঁর জীবনভিত্তিক বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে অধ্যাপক ইউনুসের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান ঘটে দ্রুত। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি প্রথমবার কুমিল্লা-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮৬, ১৯৮৮ এবং ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনেও একই আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা-৫-এর মানুষের ভোটে তিনি মোট চারবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সময় ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের মধ্যেও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বজায় থাকা। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন এলেও এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা ছিল তাঁর রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
অধ্যাপক ইউনুসের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতিচারণ ও স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক লেখাগুলোতে এলাকার উন্নয়নকে রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ১৯৮৬ সালের পর তৎকালীন সরকারের সঙ্গে কাজ করার সময় ব্যক্তিগত পদ-পদবি বা ক্ষমতার চেয়ে এলাকার উন্নয়নমূলক দাবিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তাঁর জীবনভিত্তিক বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। বুড়িচংয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ, গোমতী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, সড়ক যোগাযোগসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর ভূমিকার কথাও স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক লেখাগুলোতে পাওয়া যায়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে এক কথায় বলতে গেলে—ক্ষমতা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যমের চেয়ে জনগণের উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল বলে তাঁর স্মৃতিচারণে প্রতিফলিত হয়।
একজন রাজনীতিবিদের মূল্যায়ন শুধু তাঁর নির্বাচনী সাফল্য কিংবা রাজনৈতিক পদ দিয়ে হয় না; তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, নীতি ও নৈতিকতাও সেই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অধ্যাপক ইউনুসকে নিয়ে প্রকাশিত স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে, তিনি নিজের কিংবা স্ত্রীর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেননি, সন্তানদের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ক্ষমতার ব্যবহার করেননি এবং সন্তান বা আত্মীয়স্বজনকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেননি। সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে অন্যায় বা অবৈধ সুপারিশ না করার কথাও তাঁর জীবন নিয়ে প্রকাশিত লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এসব স্মৃতিচারণের আলোকে তাঁর জীবনদর্শন মূল্যায়ন করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—জনপ্রতিনিধিত্ব তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টির পথ নয়; বরং জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগ।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামের অসংখ্য মানুষের নাম, পারিবারিক পরিচয় এবং তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা তিনি মনে রাখতে পারতেন বলে তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। মানুষ তাঁর কাছে গেলে তাঁদের কথা শুনতেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। দলীয় পরিচয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার কথাও বিভিন্ন স্মরণসভা ও স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। এ কারণেই তাঁর মৃত্যুর পর স্থানীয়দের অনেকে তাঁকে শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন অভিভাবকসুলভ জননেতা হিসেবেও স্মরণ করেছেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের জীবনকে মূলত তিনটি বড় পরিচয়ের মধ্য দিয়ে দেখা যায়—শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধি। শিক্ষক হিসেবে তিনি মানুষ গড়ার কাজে যুক্ত ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতার জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর জীবনে এই তিনটি পরিচয় বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং একটির সঙ্গে অন্যটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। শিক্ষা তাঁকে জ্ঞান, যুক্তি ও মানবিকতার মানুষ করেছে; মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ দিয়েছে; আর রাজনীতি তাঁকে বৃহত্তর পরিসরে জনসেবার সুযোগ দিয়েছে।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে বার্ধক্যজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে কুমিল্লা-৫ তথা বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কুরআন খতম, কবর জিয়ারত, দোয়া ও স্মরণসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাবেক সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন।
একজন রাজনীতিবিদের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর নির্বাচনী ফলাফল কিংবা রাজনৈতিক পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। অধ্যাপক ইউনুসের উত্তরাধিকার খুঁজতে গেলে শিক্ষা, জনসেবা ও আদর্শ—এই তিনটি ক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা বিস্তারে একটি স্থায়ী অবদান রেখে গেছেন। চারবার সংসদ সদস্য হয়ে তিনি কুমিল্লা-৫-এর মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনদাবি নিয়ে কাজ করেছেন। আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া, অন্যায় সুপারিশ থেকে দূরে থাকা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর মানুষের কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার যে চিত্র তাঁর স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, সেটিই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকারের অংশ।
রাজনীতির ইতিহাসে অনেক নাম আসে, অনেক নাম সময়ের সঙ্গে হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের সময়কে অতিক্রম করে একটি অঞ্চলের সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস ছিলেন তেমনই এক চরিত্র—যাঁর জীবনে একই সঙ্গে রয়েছে শিক্ষার আলো, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময়, জাতীয় সংসদের রাজনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।
তিনি ছিলেন শিক্ষক—মানুষ গড়ার কাজে। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা—স্বাধীনতার সংগ্রামে। তিনি ছিলেন সংসদ সদস্য—জনগণের প্রতিনিধিত্বে। তিনি ছিলেন শিক্ষা উদ্যোক্তা—একটি অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তারে। আর মানুষের স্মৃতিতে তিনি রয়ে গেছেন একজন জনসম্পৃক্ত নেতা হিসেবে।
কুমিল্লা-৫-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের অধ্যায় তাই শুধু একজন চারবারের সংসদ সদস্যের জীবনী নয়; এটি একটি প্রজন্মের শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও জনসেবার সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের সামনে একটি প্রশ্নও রেখে যায়—রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম, নাকি মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার সুযোগ?
অধ্যাপক ইউনুসের জীবন ও কর্মের স্মৃতিচারণে যে উত্তরটি পাওয়া যায়, তা হলো—ক্ষমতার স্থায়িত্ব নয়, মানুষের আস্থাই একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত উত্তরাধিকার।
মরহুম অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ তাঁর জীবনের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।