মোঃ শাহজাহান বাশার
রাষ্ট্রের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষায় সাংবাদিকদের অবদান অনস্বীকার্য হলেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও দেশের সাংবাদিক সমাজ আজও ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত— এমন অভিযোগ তুলে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো সাংবাদিকদের এক গুরুত্বপূর্ণ দাবি সমাবেশ। জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহ উদযাপন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রেস ক্লাব এর সামনে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রমনা পার্কে গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের কুলীন ও সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের কথা বারবার শোনা হলেও তৃণমূল পর্যায়ের মফস্বল সাংবাদিকদের বাস্তবতা কখনো গুরুত্ব পায় না। অথচ মাঠপর্যায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন তারাই। বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের বছরের পর বছর শুধু কথার ফুলঝুরি, আশ্বাস ও ‘জাতির বিবেক’ উপাধি দিয়ে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। সাংবাদিক সমাজ তাদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আর অবহেলা বা প্রতিশ্রুতির রাজনীতি নয়— এবার বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায় সাংবাদিকরা।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সরকার সাংবাদিকদের সহযোগী শক্তি হিসেবে না দেখে বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে পেশাগত নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, আইনি সুরক্ষা ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্য, হামলা-মামলা, হয়রানি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার শিকার হচ্ছেন। বক্তারা আরও বলেন, রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী সাংবাদিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও প্রাপ্য কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই শক্তিশালী হবে না।
সমাবেশ থেকে ১৪ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— জাতীয় গণমাধ্যম সপ্তাহকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, পেশাদার সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন, সাংবাদিক নিয়োগ নীতিমালা তৈরি, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, গণমাধ্যমকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে ঘোষণা, যুগোপযোগী প্রেস কাউন্সিল আইন প্রণয়ন এবং তথ্য কমিশনের মাধ্যমে মিডিয়া ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা।
বক্তারা বলেন, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ছাড়া গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাও নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের তালিকা প্রণয়ন ও নিয়োগ নীতিমালা তৈরির যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, সেটিকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অর্গানাইজেশনের সদস্য সচিব ও এডিটরস ফোরামের সভাপতি ওমর ফারুক জালাল, জাতীয় মানবাধিকার সমিতির মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈশা, টেলিভিশন জার্নালিস্ট ফোরামের মহাসচিব কবি অশোক ধর, আরজেএফের চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম, সাংবাদিক সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের মহাসচিব সুজন মাহমুদ, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সংস্থার সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, সম্মিলিত সাংবাদিক জোটের সভাপতি মিজানুর রহমান মোল্লা, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সংস্থার চেয়ারম্যান বীথি মোস্তফা, বাংলাদেশ সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের সভাপতি আবুল হোসেন এবং জার্নালিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গাজী মামুন।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লায়ন মো. আবুল হোসেন, সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খোকন আহম্মেদ হীরা, যুগ্ম সম্পাদক নুরুল হুদা বাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক মিয়াজিসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শতাধিক সাংবাদিক নেতা ও গণমাধ্যমকর্মী।
সমাবেশে অংশ নেওয়া সাংবাদিকরা বলেন, মাঠের সাংবাদিকদের বাঁচাতে না পারলে সত্যিকারের গণমাধ্যম স্বাধীনতা কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাদের মতে, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে গণমাধ্যম খাত আরও সংকটের মুখে পড়বে।