হামিদুর রহমান, তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি :
রাজশাহীর তানোর উপজেলায় উৎসবমুখর ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া দিনব্যাপী এ আয়োজন রঙ, আনন্দ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে পরিণত হয়।
সকালের দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খানের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা বের হয়। উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি তানোরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পরিষদ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকা উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের গায়ে ছিল নানান রঙের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী পোশাক। কেউ পরেছিলেন পাঞ্জাবি, কেউ শাড়ি, আবার অনেকেই মাথায় নিয়েছিলেন বৈশাখী ফেট্টি বা পাগড়ি। শোভাযাত্রার আগে ও পরে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশসহ বৈশাখী খাবার। পাশাপাশি উপস্থিতদের মাঝে বিতরণ করা হয় বৈশাখী গামছা, যা উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
শোভাযাত্রা শেষে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা বৈশাখী গান পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেন। শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে নির্মিত মঞ্চে একের পর এক গান, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
এছাড়াও শহীদ মিনারের উত্তর-পূর্ব পাশে এবং নির্বাচন অফিসের সামনে বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় মোট ছয়টি স্টলে সাজানো ছিল বিভিন্ন বৈশাখী সামগ্রী—হস্তশিল্প, মাটির তৈরি পণ্য, পাখা, গামছা ও ঐতিহ্যবাহী অলংকার। দর্শনার্থীদের ভিড়ে মেলাটি হয়ে ওঠে উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
দিনব্যাপী এ আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) বার্নাবাস হাসদাক। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাসুদ পারভেজ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. ওয়াজেদ আলী, সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিজান, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক একরাম আলী মোল্লা, মহিলা দলের সভানেত্রী পলি খাতুন, উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ডিএম আক্কাস আলী, উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহার, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হাবিবা খাতুনসহ অন্যান্যরা।
ইউএনও নাঈমা খান তার বক্তব্যে বলেন, “বৈশাখ আমাদের প্রাণের স্পন্দন। এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বৈশাখ মানেই হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নতুন করে পথচলা শুরু করা। এই উৎসব আমাদের ঐক্যের বার্তা দেয়।” তিনি নতুন বছরে সকল ভেদাভেদ ভুলে মিলেমিশে চলার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠনের সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
এদিকে তানোর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও পৃথকভাবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা ও মেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বার্তা।
সব মিলিয়ে তানোরে পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত, উৎসবমুখর ও ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলায়।