মোঃ শাহজাহান বাশার
মাদক আজ শুধু একটি অপরাধের বিষয় নয়; এটি আমাদের সমাজ, পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক নীরব মহামারী। শহর থেকে গ্রাম, স্কুলের গেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল, এমনকি শ্রমজীবী মহল্লা থেকে উচ্চবিত্ত এলাকা—কোথাও যেন এর বিষাক্ত থাবা থামছে না। আমরা যদি এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেব।
মাদকের ভয়াবহতা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই; চারপাশের বাস্তবতাই যথেষ্ট। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, তরুণদের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে, নৈতিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত হচ্ছে। একজন মাদকাসক্ত শুধু নিজের জীবনই ধ্বংস করে না—সে তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপরও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। চুরি, ছিনতাই, হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন—এসব অপরাধের পেছনে অনেক সময়ই মাদকের ভয়ংকর প্রভাব কাজ করে।
মাদক ব্যবসা আজ একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। সীমান্তপথ, নদীপথ, এমনকি ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কখনো কখনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এই ব্যবসা টিকে থাকে—যা রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান প্রশংসনীয় হলেও, কেবল অভিযান দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আমাদের প্রথম কাজ হতে হবে—সচেতনতা। পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে প্রতিরোধ। সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, মানসিক অবস্থা—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সজাগ থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত কাউন্সেলিং, নৈতিক শিক্ষা ও ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সমাজকে সচেতন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ। মাদক ব্যবসায়ী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সীমান্ত এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—মাদকাসক্ত ব্যক্তি শাস্তির পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেরও দাবিদার। কেবল কারাগারে পাঠিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র বাড়াতে হবে, যেখানে কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন আসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, মাদকবিরোধী আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার বানানো যাবে না। এটি হতে হবে সর্বদলীয়, সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক, অভিভাবক, তরুণ সমাজ—সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। মিডিয়ার দায়িত্বও কম নয়; অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে সত্য তুলে ধরতে হবে নির্ভয়ে।
আজ প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা—“না” বলার সাহস তৈরি করা। একজন তরুণ যদি মাদকের প্রস্তাবে দৃঢ়ভাবে “না” বলতে শেখে, একটি পরিবার যদি সন্তানের পাশে দাঁড়ায়, একটি সমাজ যদি মাদক ব্যবসায়ীকে সামাজিকভাবে বয়কট করে—তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব।
মাদক কেবল ব্যক্তির নয়, জাতির শত্রু। আমরা যদি উন্নত, মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে মাদকবিরোধী সংগ্রামকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের সব সাফল্য মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।