ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। আগামী ১২ মার্চ বসতে যাওয়া এ অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট। জোটের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নতুন সংসদের সূচনাতেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তারা ইতিবাচক।
সম্প্রতি একটি দৈনিকে দেওয়া রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় আসে তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, রাষ্ট্রপতি ‘অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয়’ বিষয় প্রকাশ করে শপথ ভঙ্গ করেছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
এদিকে জামায়াতের মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলটির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে হবে।”
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়।প্রক্রিয়াটি হলো—সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়।নোটিশের ১৪ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তা আলোচনায় আনতে হয়। দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়।
তবে বাংলাদেশে এখনো কোনো রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অভিশংসনের নজির নেই।
২০০১ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী-কে ২০০২ সালে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি ২১ জুন পদত্যাগ করেন।
জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা অভিশংসন প্রস্তাব দেওয়ার পক্ষেই আছি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।”
দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এনসিপির নেতারা অভিযোগ করছেন, জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। একইসঙ্গে তারা আর্থিক অনৈতিকতার অভিযোগও উত্থাপন করেছেন।
দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, “নতুন সংসদকে ফ্যাসিবাদের ধারাবাহিকতা থেকে মুক্ত রাখতে প্রথম অধিবেশনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিই ভাষণ দেবেন।
অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর কাছে চিঠি দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ থেকে বিরত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া অভিশংসন সম্ভব নয়। ফলে সরকারি দল বিএনপি যদি সমর্থন না দেয়, তাহলে প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্রথম অধিবেশনেই এ ইস্যু উত্থাপিত হলে সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধু স্পিকার নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—রাষ্ট্রপতির ভবিষ্যৎ নিয়েও হতে পারে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। এখন দেখার বিষয়, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কতদূর এগোয় এবং রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।