হামিদুর রহমান,
তানোর রাজশাহী প্রতিনিধি
রাজশাহীর তানোরে একশ্রেণীর অসাধু সার ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সার সংকট সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন, কিছু ডিলার তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সারের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। চলতি আমন মৌসুমে তানোরের কৃষকদের সারের জন্য ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ থাকলেও কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হয়েছে। এতে প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে আমন চাষে আগ্রহ হারাতে শুরু করেছেন অনেক কৃষক।
সামনে আসন্ন বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই অসাধু ডিলার চক্র। স্থানীয় কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, গত দেড় যুগে যা ঘটেনি— এবার তানোরে বড় ধরনের সার সংকট দেখা দিতে পারে। শুধু বোরো নয়, আলু চাষিরাও বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

গত বছর আলু উৎপাদন বেশি হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। এ অবস্থায় আবারও বেশি দামে সার কিনতে হলে অনেকের কাঁধে ঋণের বোঝা বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তানোরে এখন বাজারে সারের দাম বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত দুই মাসে সব ধরনের রাসায়নিক সারের দাম বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত।
ডিএপি সার (৫০ কেজি): প্রতি বস্তা ৫০০ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ২,১০০ টাকা, যা এক মাস আগেও ছিল ১,৪৫০–১,৫০০ টাকা।
এমওপি সার (বিএডিসি): সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি, বিক্রি হচ্ছে ১,৭০০–১,৭৫০ টাকায়।
টিএসপি সার: বিক্রি হচ্ছে ২,২০০–২,২৫০ টাকায়।
কৃষকেরা অভিযোগ করেছেন, অধিকাংশ ডিলার রশিদ দিচ্ছেন না, বরং রশিদ চাইলে সার দিতে অস্বীকৃতি জানানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে চলতি অর্থবছরে রাসায়নিক সারের বার্ষিক চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ সার আমদানি এবং বাকি ২০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাই মাসের চাহিদা মিটিয়ে সরকার এখনও ৬ লাখ ৩০ হাজার ৬১৩ টন ইউরিয়া, ২ লাখ ১৭ হাজার টন টিএসপি, ২ লাখ ৭৩ হাজার টন ডিএপি, এবং ২ লাখ ৮১ হাজার টন এমওপি সার মজুত রেখেছে। এত পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও স্থানীয় পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কৃষকদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ধান উৎপাদন ব্যাহত হবে, ফলে দেশে চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন রাতে ট্রাক ও ভুটভুটিতে সার আনা হচ্ছে তানোরে। এসব সার একশ্রেণীর ডিলার কালোবাজারে বিক্রি করে ধনী কৃষক ও আলু চাষিদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে এসব সার আসল না নকল— তা বোঝার উপায় নেই। স্থানীয় কৃষকরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, উপজেলার প্রতিটি হাট-বাজারে নৈশপ্রহরীদের দায়িত্ব দিতে হবে। রাতের আঁধারে কোনো রশিদবিহীন সার এলে সেটি আটক করে প্রশাসনকে জানাতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তানোরে বর্তমানে বিসিআইসি’র ডিলার ৯ জন এবং বিএডিসি’র ডিলার ২২ জন রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ডিলার বরাদ্দকৃত সার পুরোপুরি এলাকায় না এনে মিলগেটে বিক্রি করে দেন।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি,
ডিলাররা গুদাম থেকে সার উত্তোলনের পর বিক্রির সময় যদি প্রশাসন ও গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে যাচাই করা হয়, তাহলে অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মুঠোফোনে কল গ্রহণ করেননি, ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তানোরে সারের কৃত্রিম সংকট এখন কৃষকদের উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া নিয়ন্ত্রণে দ্রুত প্রশাসনিক তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।