নিজস্ব প্রতিবেদক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই পুলিশের একটি থানায় জব্দ করা আলামত নিয়েই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা কম্বলের সংখ্যা, জব্দ তালিকা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক অসঙ্গতি। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে থানার তৎকালীন ওসি মো. মনির হোসেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কালবেলার হাতে আসা আদালতের নথি, এসএমপি কমিশনারের শোকজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি কাভার্ডভ্যান থেকে উদ্ধার করা ৫৬০ পিস দ্বিস্তর (ডাবল পার্ট) কম্বল জব্দ করা হলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয় ৪৩০ পিস। শুধু সংখ্যাই নয়, জব্দ তালিকায় কম্বলের প্রকৃত গুণগত মানও উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদালতের নির্দেশে বিশেষ তদন্ত দল থানায় সংরক্ষিত সিলগালা করা কাভার্ডভ্যান খুলে আলামত গণনা করে। তদন্তে সেখানে ৫৬০ পিস কম্বলই পাওয়া যায় বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। উদ্ধার হওয়া কম্বলগুলো বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডের ডাবল পার্ট কম্বল ছিল।
এই ফলাফলের পর তদন্ত কর্মকর্তার পূর্বে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তব আলামতের অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন আদালতে উপস্থিত হয়ে জানান, তিনি নিজে আলামত সরেজমিনে যাচাই না করেই অন্যের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। আদালত তাঁর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থার সুপারিশ করেন।
পরবর্তীতে এসএমপি কমিশনার তাঁর বিরুদ্ধে শোকজ জারি করেন। কমিশনারের চিঠিতে তাঁর কর্মকাণ্ডকে শৃঙ্খলাভঙ্গ, অপেশাদার আচরণ ও পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন ওসি মো. মনির হোসেনের নির্দেশেই জব্দ তালিকায় কম্বলের প্রকৃত সংখ্যা কম দেখানো হয় এবং পরবর্তী তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এর মাধ্যমে আলামতের একটি অংশ আত্মসাতের পরিকল্পনা ছিল।
কালবেলার হাতে আসা কয়েকটি স্থিরচিত্রে জব্দকৃত কাভার্ডভ্যান থেকে কম্বল নামানোর দৃশ্য দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ছবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি মো. মনির হোসেন বলেন,কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছিলেন। সব কম্বল থানা হেফাজতেই ছিল এবং পরে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
এসএমপি কমিশনারের চিঠিতে তাঁর নির্দেশে অনিয়মের উল্লেখ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "কেউ কারও বিরুদ্ধে লিখলে কম লিখে না।"
এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনজীবীদের মতে, আদালতের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও জব্দ তালিকায় যদি অসঙ্গতি থেকে থাকে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারও আইনি সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।