মোঃ শাহজাহান বাশার,
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছয় লেনে উন্নীতকরণ, সড়কের নৈরাজ্য বন্ধ এবং প্রতিদিনের প্রাণহানির মরণফাঁদ থেকে মানুষকে রক্ষার দাবিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ রোববার (৩০ নভেম্বর) দিনব্যাপী চার স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন। সকাল ৯টা থেকে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, কেরানিহাট ও দোহাজারী—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ জংশনে হাজারো মানুষ সড়কে অবস্থান নিয়ে স্লোগান শুরু করলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য—চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এখন যেন এক ‘মরণফাঁদ’। মহাসড়কের চরম বিপজ্জনক অবস্থা, বেপরোয়া গতির যানবাহন, যানজট, ভাঙাচোরা লেন এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—“সংবাদপত্র খুললেই দেখি একই পরিবারের ৩-৫ জন করে মানুষ মারা যাচ্ছে। কাকে রেখে কাকে শোক করব? আমাদের সন্তানরা রাস্তায় বের হলে আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি—ফিরে আসবে কি আসবে না!”
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বহুদিন ধরে মহাসড়কটি প্রশস্তকরণ, ছয় লেন বাস্তবায়ন, ফুটওভার ব্রিজ, ডিভাইডার, স্পিড কন্ট্রোল, সিসিটিভি স্থাপনসহ নিরাপদ সড়কের বিভিন্ন দাবি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
তাদের মতে—“এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রাণের দাবি। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমরা সবাইকে জানিয়েছি, স্মারকলিপিও দিয়েছি, কিন্তু মাঠে কার্যকর কাজ শূন্য।”
এলাকাবাসী জানান, মহাসড়ক উন্নয়ন ও সড়ক নিরাপত্তার একই দাবিতে গত ৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে বৃহত্তর মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১১ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছেও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
কিন্তু এত উদ্যোগ সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না আসায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে আবারও রাস্তায় নামেন।
চকরিয়া, লোহাগাড়া, কেরানিহাট ও দোহাজারীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সকাল থেকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজারমুখী যাত্রীরা অসহায় অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। অনেক পরিবহন যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে মাঝপথে নামতে বাধ্য হন। ব্যবসায়ী ও পণ্যবাহী গাড়িগুলো আটকে পড়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিক্ষোভকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন—দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে।
তারা বলেন—“আমরা সন্ত্রাসী নই, আমরা ধ্বংসযজ্ঞে বিশ্বাস করি না। আমরা শুধু বাঁচতে চাই। নিরাপদ সড়ক চাই। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
সাতকানিয়া-লোহাগাড়া অঞ্চলের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবহন শ্রমিক, পথচারী, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক—সবাই এই আন্দোলনে অংশ নেন।
অনেকে বলেন—“দক্ষিণ চট্টগ্রামের উন্নয়ন বলতে হলে এই মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করতেই হবে। এটি শুধু একটি সড়ক নয়—এটি ৫০ লাখ মানুষের জীবনরেখা।”
মানুষের প্রাণরক্ষার স্বার্থে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
এলাকাবাসী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন—“আমাদের দাবির ব্যাপারে সরকার যদি দ্রুত কার্যকর ঘোষণা না দেয়, তবে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”