মোঃ শাহজাহান বাশার
উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে মানবতার কাণ্ডারি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত নাম হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (কাদ্দাসা সিররাহুল আজিজ) [১৮২৬–১৯০৬ খ্রি.]। তাঁর সাধনা, আত্মশুদ্ধির দর্শন ও মানবপ্রেমভিত্তিক কর্মধারা যুগের পর যুগ ধরে অসংখ্য মানুষের জীবন ও মননে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক হিসেবে তিনি ইসলামী সুফিবাদের এমন এক পথনির্দেশনা উপহার দেন, যেখানে শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বয়ে আত্মার পরিশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দেওয়া হয়। মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ পরিণত হয় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য আধ্যাত্মিক মিলনকেন্দ্রে, যেখানে শান্তি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রচারিত হয়।
আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক প্রশান্তির লক্ষ্যে গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী উছুলে ছাবয়া বা সপ্তকর্মভিত্তিক সাধন-পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে মানুষ কুপ্রবৃত্তির প্রভাব কাটিয়ে সংযমী ও ইবাদতমুখী জীবন গঠনে সক্ষম হয়। জিকির, ইবাদত ও আল্লাহপ্রেমভিত্তিক জীবনধারাই মাইজভাণ্ডারী তরিকার মূল বৈশিষ্ট্য।
তাঁর ওফাতের পূর্বে আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে তিনি নাতি হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (কাদ্দাসা সিররাহুল আজিজ) [১৮৯৩–১৯৮২]-কে খিলাফত প্রদান করেন। তিনি মাইজভাণ্ডারী তরিকার দর্শন, ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে বহু গ্রন্থ রচনা করেন, যা এই তরিকাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রদান করে।
পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তাঁর তৃতীয় পুত্র হজরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)-কে খিলাফত প্রদান করা হয়। বর্তমান গদিনশীন হিসেবে তিনি বাইয়াত প্রদান, আধ্যাত্মিক শিক্ষা, তরিকার তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি মানবকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যাচ্ছেন। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সচেতনতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রকাশনাসহ বহুমুখী সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত খানকা ও দায়রা শরিফগুলো আজ আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সুফিবাদের প্রচার ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ‘সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী স্বর্ণপদক’ প্রবর্তনের মাধ্যমে জ্ঞানী ও সাধকদের সম্মানিত করা হচ্ছে।
শরাফতের এই ধারাকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে ২০১১ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র শাহজাদা সৈয়দ আহমদ হোসাইন মুহাম্মদ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী)-কে পরবর্তী সাজ্জাদানশীন হিসেবে মনোনীত করা হয়। তাঁর নেতৃত্ব ও আচরণে মাইজভাণ্ডারী দর্শন নতুন প্রজন্মের মাঝেও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
ভক্ত-আশেকদের বিশ্বাস, হজরত গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর গাউছিয়ত ও কুতুবিয়তের মহিমায় সমৃদ্ধ এই আধ্যাত্মিক ধারা কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর ফয়ুজাত ও বরকত লাভের তৌফিক দান করুন। আমিন।