মোঃ শাহজাহান বাশার
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা আর আগের মতো সরল নেই। আজকের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য বা আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং ভূ-কৌশলগত স্বার্থের জটিল সমীকরণে আবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কোনো রাষ্ট্রের জন্য “একক পক্ষ নির্ভরতা” যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অন্ধ বিরোধিতাও আত্মঘাতী।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, বাজার ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত—সুষম, বাস্তববাদী এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থান।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্থায়ী কোনো বন্ধু বা শত্রু নেই; স্থায়ী হলো কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থ। তাই কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি অপ্রয়োজনীয় দূরত্বও উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। রাষ্ট্রকে সবসময় কৌশলগত ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান ও ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে—“সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়।” এই নীতির গভীরতা কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। কারণ একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বহুমুখী সম্পর্কই উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার প্রধান চালিকাশক্তি।
আজকের বিশ্বে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অর্থনৈতিক সহায়তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর কিংবা সামরিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই থাকে কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট: কোনো প্রভুত্ব নয়, কোনো চাপ নয়—বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা।
বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব। তবে সেই অংশীদারিত্ব হতে হবে শর্তহীন আধিপত্যবিহীন এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের নিশ্চয়তাসহ।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে যত বেশি স্বনির্ভরতা অর্জিত হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে দেশের কূটনৈতিক অবস্থান। অন্যদিকে দুর্বল অর্থনীতি সবসময় বাহ্যিক চাপের প্রতি সংবেদনশীল থাকে। তাই উন্নয়নই কূটনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বাংলাদেশের জন্য সময় এসেছে পররাষ্ট্রনীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, দূরদর্শী ও বহুমুখী করার। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে সতর্ক ভারসাম্যের মাধ্যমে। কোনো একক বলয়ে আটকে পড়া যেমন অনুচিত, তেমনি দোদুল্যমান অবস্থানও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা। তাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক দর্শন হতে হবে পরিষ্কার: সহযোগিতা থাকবে, তবে কোনো শর্তাধীন প্রভাব নয়; সম্পর্ক থাকবে, তবে কোনো প্রভুত্ব নয়।
একটি রাষ্ট্র তখনই মর্যাদাবান হয়, যখন সে নিজের স্বার্থ নিজে নির্ধারণ করতে পারে এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে। এই সক্ষমতাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জনের প্রধান ভিত্তি।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত বাস্তবতা-নির্ভর, স্বার্থকেন্দ্রিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। আমরা কারো বিরোধিতা চাই না, আবার কারো প্রভুত্বও মেনে নিতে পারি না। আমরা চাই সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব, সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান।
এই অবস্থানই একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশের প্রকৃত কূটনৈতিক পরিচয়।